নব নব সৃষ্টি গল্পের প্রশ্ন উত্তর
নব নব সৃষ্টি - সৈয়দ মুজতবা আলী
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (নবম শ্রেণী)
১.১ প্রাচীন যুগের সব ভাষাই –
(ক) আত্মনির্ভরশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ, (খ) পরনির্ভরশীল, (গ) বর্তমানে অপ্রচলিত, (ঘ) বহুল প্রচলিত।
১.২ রচনার ভাষা নির্ভর করে –
(ক) তার লেখকের মানসিকতার উপর, (খ) তার বিষয়বস্তুর উপর, (গ) রচনার সময়কালের উপর, (ঘ) পাঠকের চাহিদার উপর।
১.৩ বাঙালির চরিত্রে বিদ্রোহ –
(ক) বিদ্যমান নয়, (খ) অল্প পরিমাণে বিদ্যমান, (গ) বিদ্যমান, (ঘ) বহুলাংশে বিদ্যমান।
১.৪ প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলীর মতে বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যসৃষ্টি তার –
(ক) মঙ্গলকাব্যে, (খ) চর্যাগানে, (গ) পদাবলি কীর্তনে, (ঘ) বাউল গানে।
নব নব সৃষ্টি গল্পের বড় প্রশ্ন উত্তর (মান - ৫)
১. “সংস্কৃতকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষা বলাতে কারও কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়।” – ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’ শব্দের অর্থ কী? সংস্কৃত কেন এই মর্যাদা পেতে পারে? (১+৪)
অর্থ: ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো যা নিজেই নিজের অভাব পূরণ করতে সক্ষম বা যা অন্য কারো ওপর নির্ভরশীল নয়।
বিশ্লেষণ: প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলীর মতে, সংস্কৃত একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ভাষা। এর কারণগুলি হলো:
- কোনো নতুন চিন্তা, অনুভূতি বা বস্তুর জন্য নতুন শব্দের প্রয়োজন হলে সংস্কৃত অন্য কোনো ভাষা থেকে শব্দ ধার করে না।
- সংস্কৃতের নিজস্ব ধাতু বা শব্দের রদবদল ঘটিয়ে বা নতুন উপসর্গ যোগ করে অতি সহজেই নতুন শব্দ তৈরি করা যায়।
- প্রাচীনকালের হিব্রু, গ্রিক বা আবেস্তা ভাষার মতো সংস্কৃতও নিজের শব্দভাণ্ডার দিয়েই সাহিত্য ও দর্শনের সব চাহিদা পূরণ করেছে।
এই স্বকীয়তা ও সমৃদ্ধির কারণেই সংস্কৃতকে ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’ বা ‘আত্মনির্ভরশীল’ ভাষা বলা হয়।
২. “নূতন আমদানিও বন্ধ করা যাবে না।” – ‘নূতন আমদানি’র প্রসঙ্গটি ব্যাখ্যা করো। এটি বন্ধ করা যাবে না কেন?
প্রসঙ্গ: এখানে ‘নূতন আমদানি’ বলতে বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দ, বিশেষ করে আরবি, ফারসি এবং ইংরেজি শব্দের অনুপ্রবেশকে বোঝানো হয়েছে।
কারণ: লেখক মনে করেন যে ভাষার পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আধুনিক যুগের জ্ঞান-বিজ্ঞান, রাজনীতি এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনে আমরা প্রতিনিয়ত বিদেশি সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসছি। ফলে:
- ইংরেজি বা অন্যান্য বিদেশি শব্দের ব্যবহার আমাদের অজান্তেই ভাষার সঙ্গে মিশে গেছে (যেমন— আলু, কপি বা আদালতের পরিভাষা)।
- জোর করে কোনো ভাষাকে ‘বিশুদ্ধ’ রাখার চেষ্টা করলে সেই ভাষা প্রাণহীন হয়ে পড়ে।
- বাঙালি সংস্কৃতিতে সমন্বয়বাদী চেতনা থাকায় আমরা সহজেই ভিন্ন ভাষার শব্দকে আপন করে নিই। তাই এই শব্দের আমদানি বন্ধ করা অসম্ভব ও অনুচিত।
৩. “রচনার ভাষা তার বিষয়বস্তুর উপর নির্ভর করে।” – প্রবন্ধ অনুসারে উদাহরণসহ বিষয়টি বুঝিয়ে লেখো।
সৈয়দ মুজতবা আলী দেখিয়েছেন যে সাহিত্য সৃষ্টির সময় রচনার বিষয়বস্তু অনুযায়ী শব্দের নির্বাচন বদলে যায়।
- ধর্মীয় বা উচ্চাঙ্গ সাহিত্য: যখন কোনো লেখক শ্রীচৈতন্যদেব বা ধর্মতত্ত্ব নিয়ে লেখেন, তখন তাঁর ভাষায় স্বাভাবিকভাবেই প্রচুর সংস্কৃত শব্দের প্রয়োগ ঘটে।
- রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বিষয়: যখন ইনকিলাব বা সাধারণ মানুষের দাবি-দাওয়া নিয়ে লেখা হয়, তখন আরবি-ফারসি বা চলতি ভাষার শব্দের আধিক্য দেখা যায়।
- ব্যঙ্গ সাহিত্য: হুতম প্যাঁচার নকশা বা টেকচাঁদ ঠাকুরের রচনায় যে তদ্ভব বা দেশজ শব্দের সাবলীল ব্যবহার দেখা যায়, তা গম্ভীর গবেষণামূলক প্রবন্ধে সম্ভব নয়।
অর্থাৎ, লেখকের মর্জি নয়, বরং তিনি কী বিষয় নিয়ে লিখছেন— সেটাই নির্ধারণ করে দেয় রচনার ভাষা কেমন হবে।
৪. “সুতরাং ইংরেজি চর্চা বন্ধ করার সময় এখনও আসেনি।” – প্রাবন্ধিকের এই যুক্তিবিন্যাসটি আলোচনা করো।
প্রাবন্ধিক মনে করেন, ইংরেজি ভাষা বর্তমান বিশ্বে জ্ঞানের এক বিশাল আধার। তাঁর এই সিদ্ধান্তের পেছনে নির্দিষ্ট কিছু যুক্তি আছে:
- জ্ঞানের প্রসার: আধুনিক বিজ্ঞান, দর্শন এবং বিশ্বসাহিত্যের চর্চা করার জন্য ইংরেজি ভাষা একটি অপরিহার্য মাধ্যম।
- সাংস্কৃতিক যোগাযোগ: বিদেশের সাথে যোগসূত্র রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক ভাববিনিময়ের জন্য ইংরেজি আমাদের প্রয়োজন।
- শিক্ষার মাধ্যম: আমাদের উচ্চশিক্ষা এবং পেশাগত ক্ষেত্রে ইংরেজি এখনও এক বড় স্থান দখল করে আছে। হুট করে এটি বন্ধ করলে আমরা বিশ্বের থেকে পিছিয়ে পড়ব।
তবে লেখক এটাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, আমরা ইংরেজি শিখব জ্ঞান আহরণের জন্য, কিন্তু নিজেদের মাতৃভাষার অমর্যাদা করে নয়।
নব নব সৃষ্টি: বিশ্লেষণাত্মক প্রশ্নোত্তর
প্রাবন্ধিক: সৈয়দ মুজতবা আলী | পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (নবম শ্রেণী)
১. “বাঙালির চরিত্রে বিদ্রোহ বিদ্যমান।” — প্রাবন্ধিক কীভাবে এই বিদ্রোহের পরিচয় দিয়েছেন? এর তাৎপর্য লেখো।
প্রসঙ্গ: সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধে বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির বিবর্তন আলোচনা করতে গিয়ে এই মন্তব্যটি করেছেন।
বিদ্রোহের স্বরূপ: প্রাবন্ধিকের মতে, বাঙালি জাতি স্বভাবতই রক্ষণশীলতা বিরোধী। এই বিদ্রোহ দুই স্তরে দেখা যায়:
- রাজনীতি ও সমাজ: বাঙালি যখনই দেখেছে কোনো প্রথা বা নিয়ম তার স্বাধীন বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তখনই সে বিদ্রোহ করেছে। রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাঙালির এই বিদ্রোহী সত্তা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত।
- সাহিত্য ও ভাষা: ধর্মের ক্ষেত্রে বিদ্রোহ করে বাঙালি সৃষ্টি করেছে ‘পদাবলি কীর্তন’। কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে বাঙালি কবিরা সাধারণ মানুষের ভাষায় কাব্য রচনা করেছেন। যেমন— মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য বা আধুনিক যুগের মধুসূদন-রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক বিপ্লব।
তাৎপর্য: এই বিদ্রোহ কোনো ধ্বংসাত্মক কাজ নয়, বরং এটি নতুনের আবাহন। পুরানো জীর্ণ প্রথাকে ভেঙে নতুন সৃষ্টিকে গ্রহণ করার মানসিকতাই বাঙালির শ্রেষ্ঠ পরিচয়।
২. “প্রাচীন যুগের সব ভাষাই তাই।” — প্রাচীন যুগের ভাষার কোন বৈশিষ্ট্যের কথা প্রাবন্ধিক উল্লেখ করেছেন?
বৈশিষ্ট্য আলোচনা: প্রাবন্ধিক প্রাচীন যুগের ভাষা হিসেবে প্রধানত সংস্কৃত, হিব্রু, গ্রিক ও আবেস্তা ভাষার কথা বলেছেন। এই ভাষাগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘আত্মনির্ভরশীলতা’।
- স্বয়ংসম্পূর্ণতা: কোনো নতুন ভাব প্রকাশের জন্য এই ভাষাগুলো অন্য ভাষার মুখাপেক্ষী হতো না। নিজেদের শব্দভাণ্ডার দিয়েই তারা নতুন নতুন শব্দ তৈরি করে নিতে পারত।
- ধাতুর পরিবর্তন: নতুন কোনো বস্তুর নামকরণের প্রয়োজন হলে সেই ভাষার নিজস্ব ধাতু বা শব্দমূলের রদবদল ঘটিয়ে নতুন শব্দ সৃষ্টি করা হতো।
- ঋণ না নেওয়া: আধুনিক ভাষার মতো এই প্রাচীন ভাষাগুলো অন্য ভাষা থেকে অবাধে শব্দ ‘ধার’ বা ‘আমদানি’ করার প্রয়োজন বোধ করেনি।
এই স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের কারণেই প্রাচীন ভাষাগুলো আজও উচ্চতর মর্যাদার অধিকারী।
৩. “বর্তমান যুগের ইংরেজি ও বাংলা আত্মনির্ভরশীল নয়।” — প্রাবন্ধিকের এমন মন্তব্যের কারণ কী?
কারণ বিশ্লেষণ: সংস্কৃত বা প্রাচীন ভাষার তুলনায় বর্তমান যুগের ভাষাগুলোর চরিত্র ভিন্ন। প্রাবন্ধিকের এই মন্তব্যের সপক্ষে কারণগুলি হলো:
- ইংরেজি ভাষার উদাহরণ: ইংরেজি ভাষা প্রতিনিয়ত ল্যাটিন, ফরাসি বা অন্যান্য বিদেশি ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছে। বর্তমান বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার প্রয়োজনে ইংরেজি এখনও পরনির্ভরশীল।
- বাংলা ভাষার উদাহরণ: বাংলা ভাষা তার জন্মের সময় থেকেই সংস্কৃতের ওপর নির্ভরশীল ছিল। পরবর্তীকালে ফারসি, আরবি এবং বর্তমানে ইংরেজির প্রভাবে বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।
- প্রয়োজনীয়তা: কোনো আধুনিক ভাষা আজ একা চলতে পারে না। নতুন আবিষ্কার, দর্শন বা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের খাতিরে আমাদের বিদেশি শব্দের ‘আমদানি’ করতেই হয়।
তাই প্রাবন্ধিকের মতে, আধুনিক বাংলা ও ইংরেজি ভাষা সংস্কৃতের মতো ‘আত্মনির্ভর’ নয়, বরং অন্য ভাষার সংমিশ্রণে গঠিত এক এক মিশ্র ভাষা।
নব নব সৃষ্টি: উন্নত মানের প্রশ্নোত্তর (মান - ৫)
১. সংস্কৃত ভাষাকে প্রাবন্ধিক ‘আত্মনির্ভরশীল’ বলেছেন কেন? বর্তমান যুগের ইংরেজি ও বাংলা কেন আত্মনির্ভরশীল নয়?
সংস্কৃতের আত্মনির্ভরশীলতা: সৈয়দ মুজতবা আলীর মতে, সংস্কৃত ভাষা কোনো নতুন চিন্তা বা বস্তুর নামকরণের জন্য অন্য ভাষার মুখাপেক্ষী হয় না। নিজস্ব ধাতু ও শব্দভাণ্ডার ব্যবহার করে, তাতে উপসর্গ যোগ করে বা রূপান্তর ঘটিয়ে নতুন শব্দ তৈরি করার ক্ষমতাই একে ‘আত্মনির্ভরশীল’ করেছে।
ইংরেজি ও বাংলার পরনির্ভরশীলতা:
- ইংরেজি: এই ভাষা ল্যাটিন, ফরাসি বা অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষা থেকে প্রচুর শব্দ ধার করে নিজেকে গড়ে তুলেছে। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের পরিভাষার জন্য এটি আজও অন্য ভাষার ওপর নির্ভরশীল।
- বাংলা: বাংলা ভাষা তার জন্মের সময় থেকেই সংস্কৃতের ওপর ঋণী। পরবর্তীতে আরবি, ফারসি এবং ইংরেজি শব্দের সংমিশ্রণে বাংলা সমৃদ্ধ হয়েছে। অর্থাৎ, বাংলা তার নিজস্ব শব্দভাণ্ডার দিয়ে সব আধুনিক চাহিদা পূরণ করতে পারে না।
২. “বিদেশি শব্দ নেওয়া ভালো না মন্দ সে প্রশ্ন অবান্তর।” — প্রাবন্ধিক কেন এমন মনে করেন? মন্তব্যের যাথার্থ্য বিচার করো।
প্রসঙ্গ: বাংলা ভাষায় ক্রমাগত বিদেশি শব্দের প্রবেশ এবং এর শুদ্ধতা বজায় রাখা নিয়ে বিতর্কের প্রেক্ষিতে প্রাবন্ধিক এই মন্তব্য করেছেন।
যাথার্থ্য: লেখকের মতে, ভাষা একটি প্রবহমান নদীর মতো। একে জোর করে একটি গণ্ডিতে আটকে রাখা যায় না।
- বর্তমানে বিশ্বায়নের যুগে আমরা রাজনীতি, বিজ্ঞান বা চিকিৎসার প্রয়োজনে ইংরেজি বা অন্যান্য বিদেশি শব্দ ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছি।
- যে শব্দগুলো একবার আমাদের ভাষায় মিশে গেছে (যেমন— চেয়ার, টেবিল, আদালত), সেগুলো বের করে দেওয়ার চেষ্টা বৃথা।
- তাই বিদেশি শব্দ গ্রহণ করা নৈতিকভাবে 'ভালো' না 'মন্দ'— সেই তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়ে বাস্তব প্রয়োজনই বড়। সুতরাং প্রশ্নটি সত্যিই ‘অবান্তর’ বা অপ্রাসঙ্গিক।
৩. ‘হিন্দি উপস্থিত সেই চেষ্টাটা করছেন’ — এখানে কোন্ চেষ্টার কথা বলা হয়েছে? আরবি-ফারসি শব্দের বিষয়ে কী বলা যেতে পারে?
হিন্দি ভাষার চেষ্টা: হিন্দি সাহিত্যিকরা ইদানীং হিন্দি ভাষা থেকে আরবি ও ফারসি শব্দ তাড়িয়ে সেখানে সংস্কৃত শব্দ বসানোর চেষ্টা করছেন। অর্থাৎ ভাষাকে ‘শুদ্ধ’ করার নামে কৃত্রিমভাবে সংস্কৃতঘেঁষা করার কথা এখানে বলা হয়েছে।
আরবি-ফারসি শব্দ প্রসঙ্গ: প্রাবন্ধিক মনে করেন, আরবি ও ফারসি শব্দগুলো বাংলা সাহিত্যে এত গভীরভাবে গেঁথে গেছে যে তা সহজেই দূর করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন—
- বাংলা ভাষায় অনেক ক্ষেত্রে সংস্কৃত শব্দের চেয়ে আরবি-ফারসি শব্দ বেশি কার্যকর ও শক্তিশালী।
- ইসলামিক ভাবধারা বা প্রশাসনিক পরিভাষা প্রকাশের জন্য এই শব্দগুলো অপরিহার্য।
- বাঙালির মজ্জায় মিশে থাকা এই শব্দগুলোকে অস্বীকার করা মানে বাংলা সাহিত্যের একটি বিশাল অংশকে অস্বীকার করা।
নব নব সৃষ্টি: বিশেষ উত্তরমালা (মান - ৫)
১. ‘একটা নূতন খতেন নিলে ভালো হয়’— কোন্ পরিস্থিতিতে প্রাবন্ধিক কীসের খতিয়ান নিতে আগ্রহী?
প্রেক্ষাপট: প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলী লক্ষ্য করেছেন যে, বাংলা ভাষায় হিন্দি, আরবি, ফারসি এবং ইংরেজি শব্দের প্রবেশ নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে নানা বিতর্ক রয়েছে। অনেকে ভাষাকে 'শুদ্ধ' করার নামে বিদেশি শব্দ বর্জন করতে চান।
খতিয়ানের বিষয়বস্তু: প্রাবন্ধিক বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারে বিদেশি শব্দের স্থিতাবস্থা নিয়ে একটি নতুন খতিয়ান বা হিসাব নিতে আগ্রহী। তিনি দেখতে চান—
- বাংলা ভাষা থেকে আরবি-ফারসি শব্দ কতটুকু বিদায় নিয়েছে বা আদৌ নিয়েছে কি না।
- রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের মতো বরেণ্য লেখকদের রচনায় বিদেশি শব্দের সার্থক প্রয়োগ কতটা শক্তিশালী।
- বর্তমান যুগের প্রয়োজনে ইংরেজি বা অন্যান্য শব্দের প্রয়োজনীয়তা কতখানি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
অর্থাৎ, গোঁড়ামি ছেড়ে বাস্তবতার নিরিখে ভাষার বর্তমান রূপটি কেমন, লেখক সেই হিসাবটিই মেলাতে চেয়েছেন।
২. ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধে বাংলা সাহিত্যে বিদেশি শব্দ ব্যবহারের যে সকল দৃষ্টান্ত লক্ষ করা যায়, তা উল্লেখ করো।
প্রাবন্ধিক দেখিয়েছেন যে বাংলা সাহিত্যে বিদেশি শব্দ কেবল প্রয়োজনেই আসেনি, বরং তারা সাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্তগুলি হলো:
- আদালতের ভাষা: উকিল, আদালত, মক্কেল, সমন — এই শব্দগুলো আরবি ও ফারসি থেকে এসে আমাদের আইনগত পরিভাষায় স্থায়ী আসন করে নিয়েছে।
- ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক শব্দ: ইনশাআল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ বা বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিদেশি শব্দের ব্যবহার সাবলীল।
- খাদ্য ও নিত্যপণ্য: আলু, কপি বা অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের নাম যা পর্তুগিজ বা ফরাসি থেকে বাংলায় এসেছে।
- সাহিত্যিক প্রয়োগ: রবীন্দ্র-কাব্যে 'আর্জি', নজরুল সাহিত্যে প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দ এবং হুতম প্যাঁচার নকশা বা আলালের ঘরের দুলালে ব্যবহৃত কথ্য ও তদ্ভব শব্দগুলো বাংলা সাহিত্যের প্রাণশক্তি বাড়িয়েছে।
৩. বাংলা ভাষায় এখনো সংস্কৃত ও ইংরেজি চর্চার প্রয়োজন — প্রাবন্ধিকের এমন ভাবনার কারণ কী?
সৈয়দ মুজতবা আলী মনে করেন কোনো ভাষাই এককভাবে চলতে পারে না। তাঁর এই ভাবনার প্রধান কারণগুলি হলো:
সংস্কৃত চর্চার কারণ:
- বাংলা ভাষার মূল ভিত্তি হলো সংস্কৃত। আজও উচ্চাঙ্গ সাহিত্য বা গম্ভীর দর্শন বিষয়ক রচনার জন্য আমাদের সংস্কৃত শব্দভাণ্ডারের ওপর নির্ভর করতে হয়।
- নতুন পারিভাষিক শব্দ তৈরির জন্য সংস্কৃত ধাতু বা প্রত্যয় আজও সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম।
ইংরেজি চর্চার কারণ:
- ইংরেজি হলো বর্তমান বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রধান চাবিকাঠি। আধুনিক দর্শন, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিগত গবেষণার জন্য ইংরেজি ছাড়া আমাদের কোনো বিকল্প নেই।
- আন্তর্জাতিক যোগসূত্র স্থাপন এবং বিশ্বসাহিত্যের রসের আস্বাদন নিতে ইংরেজি ভাষা এখনও অপরিহার্য।
তাই প্রাবন্ধিকের মতে, মাতৃভাষাকে সমৃদ্ধ করতেই আমাদের এই দুই সমৃদ্ধ ভাষার জ্ঞান অর্জন অব্যাহত রাখা উচিত।
💡 ব্যক্তিগত পরামর্শ
সৈয়দ মুজতবা আলীর 'নব নব সৃষ্টি' প্রবন্ধটি কেবল একটি পাঠ্য নয়, এটি আমাদের ভাষার বিবর্তন বোঝার একটি চাবিকাঠি। এই অধ্যায়টি পড়ার সময় মুখস্থ করার চেয়ে মূল ভাবনার দিকে বেশি নজর দাও। লেখক কেন একটি ভাষাকে আত্মনির্ভরশীল বলছেন আর কেন অন্যটিকে বলছেন না—এই পার্থক্যটি বুঝতে পারলে পরীক্ষায় যেকোনো বড় প্রশ্নের উত্তর নিজের ভাষায় লিখতে পারবে।
📝 পরীক্ষার প্রয়োজনীয় টিপস
- ✔ উদ্ধৃতি ব্যবহার: বড় প্রশ্নের উত্তর লেখার সময় প্রবন্ধ থেকে সরাসরি ছোট ছোট লাইন উদ্ধৃতি হিসেবে ব্যবহার করো (যেমন: "নূতন আমদানিও বন্ধ করা যাবে না")। এতে উত্তরের মান অনেক বেড়ে যায়।
- ✔ শব্দার্থ খেয়াল করো: এই প্রবন্ধের বেশ কিছু সংস্কৃত এবং বিদেশি শব্দের অর্থ পরীক্ষায় আসে। তাই পাঠ্যবইয়ের শব্দার্থ অংশটি ভালো করে পড়ে রেখো।
- ✔ পয়েন্ট করে উত্তর: ৫ নম্বরের প্রশ্নের ক্ষেত্রে ছোট ছোট সাব-হেডিং বা পয়েন্ট করে উত্তর লেখো। এতে পরীক্ষকের খাতা দেখতে সুবিধা হয় এবং বেশি নম্বর পাওয়া যায়।
পোস্টটি কি তোমার উপকারে এসেছে?
তোমার কোনো প্রশ্ন থাকলে বা অন্য কোনো বিষয়ের নোটস লাগলে নিচে কমেন্ট করে জানাও। বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলো না!
© Teach Vibes - স্মার্ট পড়াশোনার সঠিক দিশা
সাধারণ কিছু জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধে কোন ভাষাকে ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’ বলা হয়েছে?
উত্তর: প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলী সংস্কৃত ভাষাকে ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’ বা ‘আত্মনির্ভরশীল’ ভাষা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
প্রশ্ন: বাংলা ভাষা কি আত্মনির্ভরশীল ভাষা?
উত্তর: না, লেখকের মতে বাংলা ভাষা আত্মনির্ভরশীল নয়; কারণ এটি তার প্রয়োজনে সংস্কৃত, আরবি, ফারসি এবং ইংরেজি শব্দের ওপর নির্ভর করে।
প্রশ্ন: বাঙালির শ্রেষ্ঠ সাহিত্য সৃষ্টি কোনটি?
উত্তর: সৈয়দ মুজতবা আলীর মতে, বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্য সৃষ্টি হলো তার ‘পদাবলি কীর্তন’।
প্রশ্ন: হিন্দি সাহিত্যে বর্তমানে কোন প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে?
উত্তর: হিন্দি সাহিত্য থেকে আরবি-ফারসি শব্দ তাড়িয়ে সেখানে সংস্কৃত শব্দ বসানোর একটি প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

0 মন্তব্যসমূহ