আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি – শঙ্খ ঘোষ।
আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি - অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (১ নম্বর)
আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি - ৩ নম্বরের সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
- 🔹 কারণ: শঙ্খ ঘোষের কবিতায় সাধারণ মানুষের অস্তিত্ব আজ চরম সংকটে। তাদের ডানপাশে ধস, বামে গিরিখাদ, মাথায় বোমারু বিমান আর পায়ে হিমানীর বাঁধ—অর্থাৎ সবদিক থেকেই তারা অবরুদ্ধ ও বিপন্ন।
- 🔹 পরিণতি: নিরাপদ আশ্রয়ের কোনো পথ না পেয়ে সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এই পথহীনতা তাদের জীবনে চরম অনিশ্চয়তা এবং মৃত্যুর হাতছানি নিয়ে এসেছে।
- 🔹 কাদের ঘর: এখানে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ ও শোষণের শিকার হওয়া ঘরবাড়িহীন নিরন্ন সাধারণ মানুষের কথা বলা হয়েছে।
- 🔹 কেন উড়ে গেছে: যুদ্ধের ভয়াবহতায় আকাশপথ থেকে অবিরাম বোমাবর্ষণের ফলে এই অসহায় মানুষদের মাথার ওপরের সামান্য আশ্রয়টুকুও ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।
- 🔹 গভীর শোক: শিশুদের মৃতদেহ বা 'শব' দেখে কবি গভীরভাবে ব্যথিত ও মর্মাহত হয়েছেন। শিশুরা হলো আগামী দিনের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, তাদের মৃত্যু সভ্যতার পতনকে নির্দেশ করে।
- 🔹 নৈরাশ্য ও সংশয়: এই মর্মান্তিক দৃশ্য কবির মনে চরম নৈরাশ্য সৃষ্টি করেছে এবং তিনি মানবসভ্যতা ও মানবিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান হয়ে উঠেছেন।
- 🔹 চারদিকের মৃত্যুমিছিল: যুদ্ধের ধ্বংসলীলায় যখন শিশুদের নিথর দেহ সর্বত্র ছড়িয়ে আছে এবং মাথার ওপর মরণদূত হিসেবে বোমারু বিমান ঘুরছে, তখন সাধারণ মানুষের মনে চরম প্রাণভীতি কাজ করছে।
- 🔹 অস্তিত্বের সংকট: বেঁচে থাকার কোনো অবলম্বন বা ইতিহাস না থাকায় বক্তার মনে হয়েছে, হয়তো অন্যদের মতো তারাও এই মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে যাবেন।
- 🔹 কাদের: এখানে শোষিত, লাঞ্ছিত এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর সাধারণ অসহায় মানুষদের কথা বলা হয়েছে।
- 🔹 কেন ঢাকা: এটি মূলত 'পরিচয়হীনতা' ও 'প্রতিবাদহীনতার' প্রতীক। সাধারণ মানুষ হয় শাসকশ্রেণির চাপে সত্য বলতে ভয় পায়, অথবা তারা এমন এক পরিস্থিতির শিকার যেখানে তাদের কোনো অস্তিত্ব বা কণ্ঠস্বরের গুরুত্ব নেই।
- 🔹 অধিকারহীনতা: সাধারণ মানুষ যুগ যুগ ধরে তাদের মৌলিক অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত। তারা রাষ্ট্র বা সমাজের কাছে ব্রাত্য।
- 🔹 অসহায়ত্ব: যুদ্ধের করাল গ্রাসে ঘরবাড়ি হারিয়ে তারা আজ সর্বহারা। অন্যের দয়া বা ভিক্ষার ওপর নির্ভর করে তাদের জীবন অতিবাহিত করতে হয় বলেই বক্তার এই করুণ উপলব্ধি।
- 🔹 মানবিকতার অবক্ষয়: কবি দেখেছেন চারদিকে শিশুদের লাশ ছড়ানো, ঘরবাড়ি ধ্বংস হচ্ছে, অথচ বিশ্ব বিবেক নীরব। মানুষের মধ্যে সংবেদনশীলতা ও দয়া-মায়া হারিয়ে গেছে।
- 🔹 বিবেকের মৃত্যু: যখন জগতজুড়ে ধ্বংসলীলা চললেও কেউ প্রতিবাদ করে না, তখন কবির মনে হয় পৃথিবী তার প্রাণশক্তি তথা মানবিকতা হারিয়ে মৃতপ্রায় হয়ে গেছে।
- 🔹 চরম নৈরাশ্য: যুদ্ধের ধ্বংসলীলায় যখন ঘরবাড়ি, ইতিহাস ও আশ্রয়—সবই হারিয়ে গেছে, তখন মানুষের মনে চরম শূন্যতা বিরাজ করছে।
- 🔹 আশার আলো: সব হারাবার মাঝেও কবি দেখেন অল্প কয়েকজন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ টিকে আছে। এই ‘ক-জন’ মানুষের ঐক্যবদ্ধ থাকাই ভবিষ্যৎ পৃথিবী গড়ার একমাত্র আশার পথ।
- 🔹 শাসকের ইতিহাস: প্রচলিত ইতিহাস সবসময় জয়ী এবং ক্ষমতাবানদের জয়গান গায়। সেখানে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম বা ত্যাগের কোনো স্থান থাকে না।
- 🔹 বিকৃতি ও অবহেলা: সাধারণ মানুষের ইতিহাস হয় অলিখিত থাকে, না হয় ক্ষমতাবানদের দ্বারা বিকৃত হয়। এই অবহেলিত জনপদ ও তাদের পরিচয়হীনতাকেই কবি ‘ইতিহাস নেই’ বলে অভিহিত করেছেন।
- 🔹 সংহতিপ্রিয় মানুষ: এখানে ‘ক-জন’ বলতে যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মাঝেও টিকে থাকা সেই মুষ্টিমেয় সাধারণ মানুষকে বোঝানো হয়েছে যারা এখনও মানবিকতা হারায়নি।
- 🔹 ঐক্যের প্রতীক: কবি বিশ্বাস করেন, এই অল্প ক-জন মানুষ যদি একে অপরের ‘হাতে হাত রেখে’ ঐক্যবদ্ধ হয়, তবেই প্রতিকূল পরিস্থিতি জয় করে নতুন সমাজ গড়া সম্ভব।
আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি - ৫ নম্বরের রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
১. ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
ভূমিকা: আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি শঙ্খ ঘোষের ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতাটি একটি গভীর জীবনমুখী ও সমাজসচেতন সৃষ্টি। সাহিত্যের নামকরণ সাধারণত বিষয়বস্তু বা মূল ভাবনার ওপর ভিত্তি করে হয়।
- ✅ বিপন্ন অস্তিত্ব: কবিতায় কবি দেখিয়েছেন সাধারণ মানুষের চারদিকে মৃত্যুফাঁদ—ডানে ধস, বাঁয়ে গিরিখাদ, মাথায় বোমারু। এই ভয়াবহ সংকটে মানুষের ব্যক্তিগত অস্তিত্ব বিপন্ন।
- ✅ ঐক্যের ডাক: যখন সমাজ ও রাষ্ট্র সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন কবি একমাত্র উপায় হিসেবে ‘বেঁধে বেঁধে থাকা’ অর্থাৎ সংহতি বা একতার কথা বলেছেন। ‘হাতে হাত রেখে’ চলার আহ্বানই কবিতার মূল উপজীব্য।
- ✅ ব্যঞ্জনা: ‘বেঁধে বেঁধে থাকা’ শব্দবন্ধটি কবিতায় দুবার ব্যবহৃত হয়ে সংহতির প্রয়োজনীয়তাকে জোরালো করেছে। এটি কেবল টিকে থাকার লড়াই নয়, বরং একতাবদ্ধভাবে ধ্বংসকে রুখে দেওয়ার স্বপ্ন।
উপসংহার: কবিতার প্রতিটি ছত্রে বিপন্নতা থেকে মুক্তির পথ হিসেবে ঐক্যের জয়গান গাওয়া হয়েছে বলে এর নামকরণটি অত্যন্ত সার্থক হয়েছে।
২. “আমাদের ইতিহাস নেই / অথবা এমনই ইতিহাস” – উক্তিটির পরিপ্রেক্ষিতে কবির ইতিহাস ভাবনার পরিচয় দাও।
- ⭐ ক্ষমতার দর্পণ: কবি মনে করেন প্রচলিত ইতিহাস সবসময় জয়ী এবং ক্ষমতাবানদের জয়গান গায়। সেখানে সাম্রাজ্য বিস্তারের কথা থাকে, কিন্তু সাধারণ মানুষের যন্ত্রণার কথা থাকে না।
- ⭐ বিস্মৃতি ও বিকৃতি: ‘ইতিহাস নেই’ বলতে কবি সাধারণ মানুষের অবহেলার কথা বলেছেন। আর ‘এমনই ইতিহাস’ বলতে বুঝিয়েছেন যেটুকু ইতিহাস বর্তমান, তা শাসকশ্রেণীর দ্বারা বিকৃত ও নিয়ন্ত্রিত।
- ⭐ অসহায়ত্বের দলিল: সাধারণ মানুষের ইতিহাস হলো—হারা জেতা, দোরে দোরে ফেরা এবং পরিচয়হীনতার ইতিহাস। তাদের চোখ-মুখ ঢাকা থাকে বলে তারা কোনোদিন ইতিহাসের পাতায় স্থান পায় না।
মূল কথা: কবির ইতিহাস ভাবনা মূলত সাধারণ মানুষের অস্তিত্বহীনতা এবং উচ্চবিত্ত সমাজ দ্বারা ইতিহাস নিয়ন্ত্রণের এক নিপুণ প্রতিফলন।
৩. কবিতায় সমকালীন সংকট ও তা থেকে উত্তরণের উপায় আলোচনা করো।
সমকালীন সংকট:
- সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের নৃশংসতায় শিশুদের শবদেহ সর্বত্র ছড়িয়ে আছে।
- মানুষের মাথার ওপর ‘বোমারু’ বা ধ্বংসের আতঙ্ক এবং ঘরবাড়িহীন শূন্যতা।
- পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ও পরিচয়হীনতা প্রকট।
উত্তরণের উপায়:
বিপন্নতা থেকে বাঁচার জন্য কবি ‘বেঁধে বেঁধে থাকা’র কথা বলেছেন। এই সংকটময় সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে লড়ে জেতা অসম্ভব। তাই ‘হাতে হাত রেখে’ একতাবদ্ধ হওয়া এবং একে অপরের বিপদে ঢাল হয়ে দাঁড়ানোই হলো মুক্তির একমাত্র পথ।
৪. “আমাদের চোখমুখ ঢাকা / আমরা ভিখারি বারোমাস” – পঙক্তি দুটির মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের যে অসহায়তা ফুটে উঠেছে তা বুঝিয়ে লেখো।
- 📍 পরিচয়হীনতা: ‘চোখমুখ ঢাকা’ থাকা বলতে কবি সাধারণ মানুষের প্রতিবাদহীনতা ও ব্যক্তিত্বের সংকটকে বুঝিয়েছেন। তারা সত্য দেখেও বলতে পারে না, যা তাদের পঙ্গুত্বকে প্রকাশ করে।
- 📍 সামাজিক বঞ্চনা: ‘ভিখারি বারোমাস’ শব্দটির মাধ্যমে কবি বুঝিয়েছেন সাধারণ মানুষ সবসময়ই অধিকারবঞ্চিত। তারা চিরকালই রাষ্ট্রের বা ধনীদের দয়ার ওপর নির্ভরশীল।
- 📍 অস্তিত্বের লড়াই: প্রতিকূল পরিবেশে আশ্রয় ও নিরাপত্তার অভাবে তারা দোরে দোরে ফেরে। এই পঙক্তি দুটি শ্রমজীবী মানুষের চিরকালীন হাহাকারের এক মর্মান্তিক চিত্র।
৫. ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতায় ‘বেঁধে বেঁধে থাকা’র প্রয়োজনীয়তা কেন অনুভূত হয়েছে?
মূল কারণসমূহ:
- ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা: যখন চারিদিকে মৃত্যুর মিছিল এবং ঘরবাড়ি ও ইতিহাস ধ্বংস হচ্ছে, তখন একতা ছাড়া বাঁচার কোনো উপায় নেই।
- মানবিকতা টিকিয়ে রাখা: পৃথিবী যখন মানবিকতা হারিয়ে ‘মরে গেছে’ বলে মনে হয়, তখন অবশিষ্ট ‘ক-জন’ মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ও সংহতি বজায় রাখা জরুরি।
- ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা: শিশুদের শবদেহ দেখে কবি আতঙ্কিত। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি নিরাপদ পৃথিবী দিতে হলে এখনই সাধারণ মানুষকে একতাবদ্ধ হতে হবে।
৬. “আমাদের শিশুদের শব / ছড়ানো রয়েছে কাছে দূরে” – এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে কবি যুদ্ধের কী রূপ তুলে ধরেছেন?
যুদ্ধের বীভৎসতা: সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের সবচেয়ে করুণ ও বীভৎস রূপ হলো নিরপরাধ শিশুদের মৃত্যু। শঙ্খ ঘোষ দেখিয়েছেন যুদ্ধ কোনো বাছবিচার করে না; তা আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎকেও অকালে স্তব্ধ করে দেয়।
- 🔴 নির্মম ধ্বংসলীলা: শিশুদের মৃতদেহ বা ‘শব’ যখন সর্বত্র ছড়িয়ে থাকে, তখন বোঝা যায় যুদ্ধের আগ্রাসন কতটা অমানবিক। এটি কেবল শারীরিক মৃত্যু নয়, বরং সভ্যতার চরম পরাজয়।
- 🔴 নিরাপত্তাহীনতা: ঘরের ভেতরেও যে শিশুরা নিরাপদ নয়, তা এই পঙক্তির মাধ্যমে পরিষ্কার হয়েছে। আকাশপথ থেকে নিক্ষিপ্ত বোমা শিশুদের কোল খালি করে দিচ্ছে।
মূল কথা: কবি এখানে যুদ্ধের সেই নির্লজ্জ রূপটি তুলে ধরেছেন যেখানে ক্ষমতা ও রাজনীতির লড়াইয়ে বলি হতে হয় নিষ্পাপ শৈশবকে।
৭. “কিছুই কোথাও যদি নেই / তবুও তো ক-জন আছি বাকি” – কবির আশাবাদ আলোচনা করো।
নৈরাশ্যের মাঝে আলো: ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতাটি চরম সংকটের কথা বললেও এর শেষে এক গভীর আশাবাদ ফুটে উঠেছে।
- ✨ সংখ্যালঘুর শক্তি: পৃথিবী ‘মরে গেছে’ বলে মনে হলেও কবি বিশ্বাস করেন যে কিছু শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ বা ‘ক-জন’ এখনও বেঁচে আছে। এই অল্প কয়েকজন মানুষই আগামীর আশার আলো।
- ✨ সংহতির জয়: যদি পৃথিবী থেকে সব মানবিকতা মুছে যায়, তবুও যারা অবশিষ্ট আছে তারা যদি একে অপরের ‘হাতে হাত’ রেখে চলতে পারে, তবেই ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন জীবন গড়া সম্ভব।
উপসংহার: কবির এই আশাবাদ মূলত মানুষের অপরাজেয় মানসিকতা এবং একতার শক্তির ওপর অদম্য বিশ্বাসের প্রতিফলন।
৮. কবিতার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বর্ণিত প্রতিকূল পরিবেশের বর্ণনা দাও।
বিপন্ন পরিবেশের চিত্র: কবি শঙ্খ ঘোষ কবিতার শুরুতেই এক অবরুদ্ধ ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন—
- ভৌগোলিক সংকট: সাধারণ মানুষের ডানপাশে ধস এবং বাঁয়ে গভীর গিরিখাদ। অর্থাৎ দু-দিকেই মৃত্যুর হাতছানি।
- আকাশপথের আতঙ্ক: মাথার ওপর দিয়ে উড়ে চলেছে ধ্বংসাত্মক ‘বোমারু’ বিমান, যা যে কোনো মুহূর্তে প্রাণ কেড়ে নিতে পারে।
- শৈত্য ও বাধা: পায়ে পায়ে ‘হিমানীর বাঁধ’ অর্থাৎ জীবন চলার পথে কঠিন বরফের মতো প্রতিকূলতা বা স্থবিরতা।
- আশ্রয়হীনতা: ঘরবাড়ি বোমায় উড়ে গেছে এবং শিশুদের মৃতদেহ চারদিকে ছড়িয়ে আছে।
এই সামগ্রিক চিত্রটি যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর এক চরম অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তাকে প্রকাশ করে।
৯. সাধারণ মানুষের অস্তিত্বের সংকট কীভাবে কবিতাটিতে প্রকাশিত হয়েছে?
- 🔸 ঠিকানাহীনতা: সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি উড়ে গেছে, তারা দোরে দোরে ফিরছে আশ্রয়ের আশায়। তাদের সামনে এগোনোর বা পিছু হটার কোনো ‘পথ নেই’।
- 🔸 পরিচয়হীনতা: তাদের ইতিহাস হয় নেই, না হয় বিকৃত। শাসকশ্রেণীর ভিড়ে তারা কেবল ‘ভিখারি’ হয়ে বারোমাস দিন কাটায়। তাদের চোখ-মুখ ঢাকা থাকে বলে তাদের কোনো স্বতন্ত্র সত্তা নেই।
- 🔸 মৃত্যুভীতি: প্রতিনিয়ত তাদের মনে প্রশ্ন জাগে—“আমরাও তবে এইভাবে / এ মুহূর্তে মরে যাব না কি?” এটিই হলো অস্তিত্বের চরম অনিশ্চয়তা।
১০. শঙ্খ ঘোষের ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতাটির মূল বক্তব্য লেখো।
সারসংক্ষেপ: ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতাটির মূল বক্তব্য হলো—চরম প্রতিকূলতা ও যুদ্ধের ধ্বংসলীলার মাঝে সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ সংহতি। কবি দেখিয়েছেন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি, ইতিহাস ও শৈশব কেড়ে নিয়েছে। চারিদিকে মৃত্যুর বিভীষিকা। এই অসহায় সময়ে ব্যক্তিগতভাবে বাঁচার কোনো পথ নেই। একমাত্র পথ হলো মুষ্টিমেয় শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের ‘হাতে হাত রাখা’ বা একে অপরের ওপর ভরসা করে ‘বেঁধে বেঁধে’ থাকা। অর্থাৎ, সংহতি ও ঐক্যই হলো সামাজিক ও মানবিক অবক্ষয় থেকে মুক্তির একমাত্র চাবিকাঠি।
আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি: নামকরণের সার্থকতা
কবি: শঙ্খ ঘোষ
সাহিত্যের নামকরণের ক্ষেত্রে সাধারণত বিষয়বস্তু, ভাববস্তু বা কোনো বিশেষ ব্যঞ্জনা প্রাধান্য পায়। আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি শঙ্খ ঘোষের ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতাটির নামকরণ এর বিষয়বস্তু এবং সমকালীন সংকটের নিরিখে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
১. বিপন্ন অস্তিত্ব ও অবরুদ্ধ পরিবেশ:
কবিতার শুরুতেই কবি দেখিয়েছেন সাধারণ মানুষের পালানোর কোনো পথ নেই। ডানে ধস, বামে গিরিখাদ, আর মাথার ওপর ‘বোমারু’ যুদ্ধবিমান—অর্থাৎ চারদিকেই মৃত্যুফাঁদ। এই অবরুদ্ধ ও অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগতভাবে বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব। এই বিপন্নতা থেকেই ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা জন্ম নেয়।
২. সংহতির ডাক (বেঁধে বেঁধে থাকা):
যখন চারদিকে শিশুদের শবদেহ ছড়ানো থাকে এবং ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়, তখন মানুষ একাকী লড়াই করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। কবি অনুভব করেছেন, এই চরম সংকটে একমাত্র বাঁচার পথ হলো সংহতি বা একতা। তাই তিনি বার বার আহ্বান জানিয়েছেন—‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’।
৩. আদর্শগত ঐক্য ও মানবিকতা:
‘বেঁধে বেঁধে থাকা’ শব্দবন্ধটি কেবল শারীরিক নৈকট্য নয়, বরং একটি আদর্শগত সংহতির প্রতীক। ইতিহাস যখন বিকৃত হয় এবং পৃথিবী যখন ‘মরে গেছে’ বলে মনে হয়, তখন অবশিষ্ট শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের ‘হাতে হাত’ রেখে চলাই হলো মানবিকতা টিকিয়ে রাখার একমাত্র উপায়।
উপসংহার
কবিতাটির শিরোনাম বা নামকরণ কেবল একটি পঙক্তি নয়, এটি একটি বাঁচার মন্ত্র। ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়েও কবি যে ঐক্যের জয়গান গেয়েছেন, তা এই নামকরণের মাধ্যমেই পূর্ণতা পেয়েছে। তাই কবিতার বিষয়বস্তু ও মূল সুরের সঙ্গে সংগতি রেখে নামকরণটি চরম সার্থকতা লাভ করেছে।
আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি - সেরা ৩০টি MCQ
মাধ্যমিক ২০২৬ পরীক্ষার জন্য বিশেষ প্রস্তুতি সেট
(ক) জীবনানন্দ দাশ (খ) শঙ্খ ঘোষ (গ) জয় গোস্বামী (ঘ) নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
(ক) বাবরের প্রার্থনা (খ) পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ (গ) জলই পাষাণ হয়ে আছে (ঘ) মূর্খ বড় সামাজিক নয়
(ক) গিরিখাদ (খ) ধস (গ) পাহাড় (ঘ) সমুদ্র
(ক) গিরিখাদ (খ) পাহাড় (গ) নদী (ঘ) অরণ্য
(ক) সামনে (খ) পিছনে (গ) মাথায় (ঘ) পায়ে
(ক) পাথরের (খ) হিমানীর (গ) রক্তের (ঘ) লোহার
(ক) বাড়ি (খ) আশ্রয় (গ) পথ (ঘ) ইতিহাস
(ক) ভেঙে (খ) উড়ে (গ) পুড়ে (ঘ) ডুবে
(ক) বড়দের (খ) সৈনিকদের (গ) শিশুদের (ঘ) পশুদের
(ক) হাসিখুশি (খ) ঢাকা (গ) রাঙানো (ঘ) খোলা
আরও ৩০টি প্রশ্নের জন্য এবং সম্পূর্ণ নোটের PDF পেতে আমাদের সাথেই থাকুন।
(ক) পাথর (খ) তুষার বা বরফ (গ) জলপ্রপাত (ঘ) কাদা
(ক) রাস্তা (খ) যানবাহন (গ) বেঁচে থাকার উপায় (ঘ) মানচিত্র
(ক) চলে যাব (খ) হারিয়ে যাব (গ) মরে যাব (ঘ) কেঁদে ফেলব
(ক) রাজাদের (খ) সৈনিকদের (গ) সাধারণ মানুষদের (ঘ) কবিদের
(ক) দশ জন (খ) ক-জন (গ) এক জন (ঘ) হাজার জন
(ক) অনিলা দেবী (খ) কুণ্ঠক (গ) জরাসন্ধ (ঘ) বনফুল
(ক) বৃষ্টি (খ) ভূমিপতন (গ) অগ্নিকাণ্ড (ঘ) বন্যা
(ক) ডান পাশে (খ) বাঁয়ে (গ) মাথার উপরে (ঘ) পিছনে
(ক) আনন্দ (খ) অবহেলা ও গুরুত্বহীনতা (গ) অহংকার (ঘ) রাগ
(ক) একা একা (খ) দূরে দূরে (গ) বেঁধে বেঁধে (ঘ) লুকিয়ে লুকিয়ে
(ক) আদেশ (খ) আহ্বান (গ) ভয় (ঘ) প্রশ্ন
(ক) ঠান্ডার জন্য (খ) লজ্জায় (গ) পরিচয়হীনতার সংকটে (ঘ) খেলার ছলে
(ক) প্রতি পদক্ষেপে (খ) দৌড়ে (গ) লাফিয়ে (ঘ) ধীরে ধীরে
(ক) ঘরে ঘরে (খ) দ্বারে দ্বারে বা দরজায় দরজায় (গ) শহরে শহরে (ঘ) বনে বনে
(ক) ঝগড়ার (খ) বন্ধুত্বের ও সংহতির (গ) কুস্তির (ঘ) ক্লান্তির
অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর
১. ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতার মূল কাব্যগ্রন্থের নাম কী?
উত্তর: কবি শঙ্খ ঘোষের ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতাটি তাঁর ‘জলই পাষাণ হয়ে আছে’ (২০০৪) নামক কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।
২. ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতাটি মূল কাব্যগ্রন্থের কত সংখ্যক কবিতা?
উত্তর: কবিতাটি ‘জলই পাষাণ হয়ে আছে’ কাব্যগ্রন্থের ৩১ সংখ্যক কবিতা।
৩. ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতায় বেঁধে বেঁধে থাকার উদ্দেশ্য কী?
উত্তর: বর্তমান সমাজ ও সময়ের চরম অনিশ্চয়তা, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের ধ্বংসলীলা এবং চারদিকের মৃত্যুমিছিল থেকে নিজেদের অস্তিত্বকে রক্ষা করাই হলো বেঁধে বেঁধে থাকার মূল উদ্দেশ্য। কবি বিশ্বাস করেন, একা লড়াই করে এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকা সম্ভব নয়; তাই জীবন ও মানবিকতা বাঁচিয়ে রাখতে ঐক্যের প্রয়োজন।
৪. ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতায় বেঁধে বেঁধে থাকার অর্থ কী?
উত্তর: কবিতায় ‘বেঁধে বেঁধে থাকা’ কথাটির আক্ষরিক অর্থ হলো একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে থাকা। তবে এর গভীর অর্থ হলো—সামাজিক সংহতি, একতা এবং ভ্রাতৃত্ববোধ। এটি মূলত সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ এবং পারস্পরিক নির্ভরশীলতার প্রতীক।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলি ও প্রশ্নোত্তর
১. ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতায় আমাদের ডান পাশে কী?
উত্তর: কবিতায় উল্লিখিত সাধারণ মানুষের ডান পাশে ধস রয়েছে।
২. "আমরা ভিখারি বারো মাস" বলার কারণ কী?
উত্তর: সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ ও শোষণের শিকার সাধারণ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি, আশ্রয় ও সঠিক ইতিহাস হারিয়ে চরম অসহায় হয়ে পড়েছে। তারা সর্বস্বান্ত এবং প্রতিনিয়ত অন্যের দয়ার ওপর নির্ভরশীল বা ব্রাত্য হয়ে দিন কাটায় বলে কবি তাদের ‘বারো মাসের ভিখারি’ বলেছেন।
৩. শঙ্খ ঘোষের ছদ্মনাম কী ছিল?
উত্তর: কবি শঙ্খ ঘোষের ছদ্মনাম ছিল ‘কুণ্ঠক’।
৪. শঙ্খ ঘোষ কিসের জন্য বিখ্যাত ছিলেন?
উত্তর: শঙ্খ ঘোষ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একজন কিংবদন্তি কবি এবং বিশিষ্ট রবীন্দ্র-গবেষক হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন। তাঁর লেখনীতে গভীর সমাজসচেতনতা, মানবিকতা এবং প্রতিবাদের সুর ফুটে উঠত। তিনি ‘জ্ঞানপীঠ’, ‘সাহিত্য অকাদেমি’ এবং ‘পদ্মভূষণ’-এর মতো মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।
৫. ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কথাটি কবিতায় কতবার ব্যবহৃত হয়েছে?
উত্তর: ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কথাটি সম্পূর্ণ কবিতায় মোট ২ বার ব্যবহৃত হয়েছে (একবার কবিতার মাঝখানে এবং একবার একেবারে শেষে)।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতাটির মূল সুর কী?
উত্তর: কবিতাটির মূল সুর হলো বিপন্নতার মাঝে সংহতি বা একতা। সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের ধ্বংসলীলা থেকে বাঁচতে সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ থাকাই এর প্রধান বার্তা।
প্রশ্ন: ‘জলই পাষাণ হয়ে আছে’ কাব্যগ্রন্থটি কত সালে প্রকাশিত হয়?
উত্তর: কবি শঙ্খ ঘোষের এই বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থটি ২০০৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিল।
প্রশ্ন: কবিতায় ‘আমাদের ইতিহাস নেই’ বলার তাৎপর্য কী?
উত্তর: এর মাধ্যমে কবি সাধারণ মানুষের বঞ্চনার কথা বুঝিয়েছেন। ইতিহাসে সাধারণত রাজাবাদশা বা বিজয়ীদের কথা থাকে, শ্রমজীবী বা সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা সেখানে স্থান পায় না।
প্রশ্ন: শঙ্খ ঘোষ কোন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন?
উত্তর: তিনি জ্ঞানপীঠ পুরস্কার (২০১৬), সাহিত্য অকাদেমি এবং পদ্মভূষণ সহ বহু সম্মানজনক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।

0 মন্তব্যসমূহ