বহুরূপী গল্পের প্রশ্ন উত্তর ও নোটস class 10

 বহুরূপী গল্পের প্রশ্ন উত্তর ও নোটস class 10


বহুরূপী গল্পের প্রশ্ন উত্তর দশম শ্রেণী 

বহুরূপী-গল্পের-প্রশ্ন-উত্তর


নমস্কার! মাধ্যমিক পরীক্ষা জীবনের অন্যতম বড় একটি ধাপ। এই সময়ে ছাত্রছাত্রীদের মনে অনেক চাপ থাকে। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সঠিক পরিকল্পনা এবং বুঝে পড়লে যেকোনো বিষয়েই ভালো ফল করা সম্ভব।

আজ আমরা পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) দশম শ্রেণীর বাংলা সিলেবাসের অন্যতম সুন্দর একটি গল্প 'বহুরূপী' নিয়ে আলোচনা করব। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সুবোধ ঘোষ-এর লেখা এই গল্পটি কেবল পাঠ্যবইয়ের একটি অধ্যায় নয়, এটি জীবনের এক গভীর পাঠ।

আসুন, খুব সহজ ভাষায় এই গল্পের গভীরে প্রবেশ করি।


বহুরূপী' গল্পের নাট্যরূপ: প্রেক্ষাপট ও শৈলী

​'বহুরূপী' গল্পটি মূলত ছোটগল্প হলেও এর মধ্যে নাট্যগুণ (Dramatic qualities) অত্যন্ত প্রবল। হরিদার বিচিত্র সাজ এবং বিভিন্ন ঘটনার ঘনঘটা গল্পটিকে সহজেই একটি মঞ্চসফল নাটকের রূপ দিতে পারে।

​১. চরিত্র চিত্রায়ণ ও সংলাপ (Character & Dialogue)

​একটি সার্থক নাট্যরূপের প্রধান শর্ত হলো জোরালো সংলাপ। গল্পটিতে হরিদার বিভিন্ন ছদ্মবেশ—যেমন পাগল, বাইজি, পুলিশ বা বিরাগী—প্রত্যেকটির জন্য আলাদা আলাদা সংলাপের মেজাজ রয়েছে।

  • বিরাগী সাজে হরিদা: জগদীশ বাবুর বাড়িতে যখন হরিদা বিরাগী সেজে যান, তখন তার সংলাপগুলোতে আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য ফুটে ওঠে। যেমন— "পরমাত্মা তো এক, শুধু দেহ আলাদা।" এটি নাটকের ক্লাইম্যাক্স তৈরিতে সাহায্য করে।

​২. দৃশ্য বিভাজন (Scene Division)

​গল্পটিকে নাট্যরূপে সাজাতে গেলে কয়েকটি প্রধান দৃশ্যে ভাগ করা যায়:

  • দৃশ্য ১: হরিদার সংকীর্ণ ঘর। বন্ধুদের আড্ডা এবং জগদীশ বাবুর বাড়িতে সন্ন্যাসীর আগমনের গল্প। (সূচনা)
  • দৃশ্য ২: চকের বাসস্ট্যান্ডে পাগল বেশে হরিদার আবির্ভাব। (চরিত্রের বহুমুখিতা প্রদর্শন)
  • দৃশ্য ৩: দয়ালবাবুর লিচু বাগান। পুলিশ সেজে মাস্টারমশাইকে বোকা বানানো। (নাটকীয় কৌতুক)
  • দৃশ্য ৪: জগদীশ বাবুর বাড়ি। বিরাগী রূপী হরিদার প্রবেশ ও কাঞ্চন ত্যাগ। (মূল নাটকীয় সংঘাত)
  • দৃশ্য ৫: পুনরায় হরিদার ঘর। সত্য প্রকাশ এবং হরিদার পেশাগত সততার জয়। (উপসংহার)

​৩. নাটকীয় সংঘাত (Dramatic Conflict)

​নাটকের প্রাণ হলো দ্বন্দ্ব। এই গল্পে আর্থিক অভাব বনাম শিল্পীসত্তার মর্যাদার এক তীব্র অন্তর্দ্বন্দ্ব দেখা যায়। জগদীশ বাবু যখন তীর্থ ভ্রমণের জন্য হরিদাকে একশো এক টাকা দিতে চান, তখন হরিদা তা প্রত্যাখ্যান করেন। এই মুহূর্তটি নাটকের সবচেয়ে উচ্চবিত্ত বা 'High Point'।

​নাট্যরূপের অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ (Unique Points)

বিষয়

নাট্যরূপের প্রভাব

আঙ্গিক অভিনয়

হরিদার বিভিন্ন রূপ সজ্জা মঞ্চে চাক্ষুষ আবেদন তৈরি করে।

শব্দ ও সংগীত

বাইজি সাজে ঘুঙুরের শব্দ বা বিরাগী সাজে ধীর শান্ত আবহ সংগীত নাটককে প্রাণবন্ত করে।

সামাজিক বার্তা

একজন দরিদ্র শিল্পী হয়েও হরিদা যেভাবে লোভকে জয় করেন, তা দর্শকের মনে গভীর রেখাপাত করে।


উপসংহার

​সুবোধ ঘোষের 'বহুরূপী' গল্পের সার্থক নাট্যরূপ আসলে হরিদার বহুরূপী জীবনেরই প্রতিফলন। নাটকের শেষে দেখা যায়, হরিদা বকশিশের আট আনাও পাননি, কিন্তু তিনি একজন প্রকৃত শিল্পীর মর্যাদা রক্ষা করেছেন। মঞ্চে এই গল্পটি উপস্থাপিত হলে তা কেবল বিনোদন নয়, বরং শোষিত শিল্পীর এক নৈতিক জয়ের গাথা হয়ে ওঠে।


বহুরূপী গল্পের প্রশ্ন উত্তর: বহুরূপী গল্পের গুরুত্বপূর্ণ নোটস গুলি প্রশ্নোত্তরে আলোচনা করা হলো 


​১ নম্বরের অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নের উত্তর:

​১. হরিদার জীবনের পেশা কী ছিল?

উত্তর: হরিদার জীবনের পেশা ছিল বহুরূপী সেজে পথে বেরিয়ে মানুষের বিনোদন করা এবং তার বিনিময়ে সামান্য কিছু উপার্জন করা।

​২. জগদীশ বাবুর বাড়িতে আসা সন্ন্যাসীর বয়স কত ছিল?

উত্তর: জগদীশ বাবুর বাড়িতে আসা সন্ন্যাসীর বয়স ছিল হাজার বছরেরও বেশি

​৩. সন্ন্যাসী সারা বছর কী খেয়ে থাকতেন?

উত্তর: সন্ন্যাসী সারা বছর শুধু একটি করে হরিতকী খেয়ে থাকতেন।

​৪. জগদীশ বাবু সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো পাওয়ার জন্য কী কৌশল নিয়েছিলেন?

উত্তর: জগদীশ বাবু একজোড়া খড়মে সোনার বোল লাগিয়ে সন্ন্যাসীর পায়ের কাছে ধরলে সন্ন্যাসী তাতে পা দেন, আর সেই সুযোগে জগদীশ বাবু পায়ের ধুলো গ্রহণ করেন।

​৫. "চকের বাসস্ট্যান্ডে ঠিক দুপুরবেলাতে একটা কাণ্ড ঘটেছিল"– কাণ্ডটি কী ছিল?

উত্তর: কাণ্ডটি ছিল হরিদার পাগল সাজ; তিনি উন্মাদ সেজে চকের বাসস্ট্যান্ডে হাতে একটি ইঁট নিয়ে বাসের যাত্রীদের ভয় দেখাচ্ছিলেন।

​৬. বাইজি ছদ্মবেশে হরিদার কত টাকা রোজগার হয়েছিল?

উত্তর: বাইজি সেজে হরিদার মোট আট টাকা দশ আনা রোজগার হয়েছিল।

​৭. হরিদা পুলিশ সেজে কোথায় দাঁড়িয়েছিলেন?

উত্তর: হরিদা নকল পুলিশ সেজে দয়ালবাবুর লিচু বাগানে দাঁড়িয়েছিলেন।

​৮. বিরাগী জগদীশ বাবুর কাছে কী চেয়ে খেতে চেয়েছিলেন?

উত্তর: বিরাগী জগদীশ বাবুর কাছে শুধু এক গ্লাস ঠান্ডা জল চেয়ে খেতে চেয়েছিলেন।

​৯. "অদৃষ্ট মোটেও দয়া করবেন না"– কার সম্পর্কে এ কথা বলা হয়েছে?

উত্তর: উদ্ধৃত কথাটি গল্পকথক ও তাঁর বন্ধুদের উপস্থিতিতে হরিদা সম্পর্কে বলা হয়েছে (বিরাগী সেজে পাওয়া ১০১ টাকা প্রত্যাখ্যান করার কারণে)।

​১০. "হরিদার উনানের হাঁড়িতে অনেক সময় কী ফোটে?"

উত্তর: হরিদার উনানের হাঁড়িতে অনেক সময় ভাতের বদলে শুধু জল ফোটে (যা তাঁর চরম দারিদ্র্যের পরিচয় দেয়)।


​৩ নম্বরের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক উত্তর :বহুরূপী গল্পের প্রশ্ন উত্তর

​১. "হরিদার জীবনে সত্যিই একটা নাটকীয় বৈচিত্র্য আছে"— হরিদার জীবনের নাটকীয় বৈচিত্র্য বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

উত্তর: সুবোধ ঘোষের 'বহুরূপী' গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হরিদা ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র। ধরাবাঁধা গতানুগতিক কাজ বা কোনো অফিসের কাজ হরিদার পছন্দের ছিল না। তিনি অভাবের মাঝেও নিজের স্বাধীনতা বজায় রাখতে চাইতেন। তাই তিনি 'বহুরূপী' সেজে মানুষের মনোরঞ্জন করে যে সামান্য আয় হতো, তা দিয়েই জীবন চালাতেন। কখনো পাগল, কখনো দয়ালবাবুর লিচু বাগানে নকল পুলিশ, কখনো বা মোহিনী বাইজি—প্রতিদিন নতুন নতুন সাজে তাঁর এই বিচিত্র জীবিকাই ছিল তাঁর জীবনের 'নাটকীয় বৈচিত্র্য'

​২. "অদৃষ্ট কখনো হরিদার এই ভুল ক্ষমা করবে না"— হরিদার কোন ভুলের কথা এখানে বলা হয়েছে? কেন তা ভুল?

উত্তর: হরিদা যখন বিরাগী সেজে জগদীশ বাবুর বাড়িতে যান, তখন জগদীশ বাবু ভক্তিভরে তাঁকে তীর্থ ভ্রমণের জন্য ১০১ টাকা দিতে চেয়েছিলেন। চরম দারিদ্র্য সত্ত্বেও হরিদা সেই টাকা স্পর্শ করেননি।

কেন ভুল: হরিদার অভাবী বন্ধুদের মতে, ঘরে চাল নেই অথচ হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলা চরম বোকামি। একশো টাকা সেই সময় অনেক বড় অংক ছিল। এই লোভ সংবরণ করাকে তাঁর বন্ধুরা 'ভুল' বলে অভিহিত করেছেন, কারণ তাঁদের ধারণা ছিল ভাগ্য বা অদৃষ্ট এমন সুযোগ বারবার দেয় না।

​৩. "বড় চমৎকার আজকের এই সন্ধ্যার চেহারা"— সন্ধ্যার চেহারার বর্ণনা দাও। সেই সন্ধ্যায় কী ঘটেছিল?

উত্তর: সন্ধ্যার বর্ণনায় লেখক জানিয়েছেন যে, সেই সন্ধ্যায় স্নিগ্ধ শান্ত জোছনা ফিনিক দিয়ে ফুটছিল এবং ফুরফুরে বাতাস বইছিল। জগদীশ বাবুর বাড়ির বাগানের গাছপালার মাথার ওপর দিয়ে একটি চাঁদের আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছিল।

ঘটনা: সেই অপরূপ সন্ধ্যায় জগদীশ বাবুর বাড়িতে এক অদ্ভুত শান্তশ্রী সম্পন্ন বিরাগী (ছদ্মবেশী হরিদা) হাজির হয়েছিলেন। তাঁর জটাহীন চুল, সাদা উত্তরীয় এবং ঝোলার ভেতর থাকা গীতা দেখে উপস্থিত সকলেই মুগ্ধ ও স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন।

​৪. "সে ভয়াবহ দুর্লভ জিনিস"— কোন জিনিসের কথা বলা হয়েছে? কেন তা দুর্লভ?

উত্তর: এখানে হিমালয় থেকে আসা সেই উচ্চমার্গের সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলোর কথা বলা হয়েছে।

কারণ: সন্ন্যাসীটি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর স্বভাবের। তিনি কাউকেই তাঁর পায়ের ধুলো নিতে দিতেন না। একমাত্র জগদীশ বাবু অত্যন্ত সুকৌশলে তাঁর জন্য সোনার বোল লাগানো খড়ম তৈরি করিয়েছিলেন। সন্ন্যাসী সেই খড়ম পরতে গেলে জগদীশ বাবু সেই সুযোগে তাঁর পায়ের ধুলো নিয়েছিলেন। সহজে পাওয়া যায় না বলেই একে 'ভয়াবহ দুর্লভ' বলা হয়েছে।

​৫. "পরমাত্মা তো এক, শুধু দেহ আলাদা"— বক্তা কে? কোন প্রসঙ্গে এই উক্তিটি করেছেন?

উত্তর: উদ্ধৃত উক্তিটির বক্তা হলেন বিরাগী ছদ্মবেশী হরিদা

প্রসঙ্গ: জগদীশ বাবু যখন আগন্তুক বিরাগীকে তাঁর নাম জিজ্ঞেস করেন এবং তাঁকে পরম সুখে ও শান্তিতে থাকার কথা বলেন, তখন বিরাগী এই দার্শনিক মন্তব্যটি করেন। বিরাগীর মতে, বাহ্যিক রূপ বা নাম আসলে তুচ্ছ; জগতের সকল প্রাণীর মধ্যেই এক পরমাত্মা বিদ্যমান, কেবল শরীরগুলি ভিন্ন। এটি হরিদার অভিনয়ের চরম মুন্সিয়ানা ছিল।

​৬. "তাতে যে আমার ঢং নষ্ট হয়ে যায়"— বক্তা কোন 'ঢং' নষ্ট হওয়ার কথা বলেছেন? এর মাধ্যমে তাঁর কোন মানসিকতা প্রকাশ পায়?

উত্তর: বক্তা হরিদা বিরাগী সেজে জগদীশ বাবুর দেওয়া নগদ ১০১ টাকা গ্রহণ না করার প্রেক্ষিতে এই উক্তিটি করেছেন। এখানে 'ঢং' বলতে তিনি তাঁর অভিনীত চরিত্রের পবিত্রতা ও শৈল্পিক মর্যাদাকে বুঝিয়েছেন।

মানসিকতা: এর মাধ্যমে হরিদার একনিষ্ঠ শিল্পীসত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি দরিদ্র হতে পারেন, কিন্তু লোভী নন। বিরাগী সাজলে লোভ ত্যাগ করতে হয়; টাকা নিলে তাঁর সেই বিরাগী চরিত্রের নৈতিক আদর্শ বা অভিনয় কলঙ্কিত হতো। তিনি পেশার চেয়ে শিল্পকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।


৫ নম্বরের রচনাধর্মী প্রশ্ন:বহুরূপী গল্পের প্রশ্ন উত্তর

​১. হরিদার চরিত্র বিশ্লেষণ করো (বৈচিত্র্যময় পেশা ও নির্লোভ শিল্পীসত্তা)

ভূমিকা: প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সুবোধ ঘোষের 'বহুরূপী' গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হরিদা একজন অতি সাধারণ, দরিদ্র কিন্তু অসামান্য শিল্পীসত্তার অধিকারী মানুষ।

  • বৈচিত্র্যময় পেশা: হরিদা গতানুগতিক ১০টা-৫টার চাকরি বা বাঁধাধরা কাজে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি ছিলেন আজন্ম স্বাধীনচেতা। তাই তিনি 'বহুরূপী' সেজে মানুষের মনোরঞ্জনকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। কখনো পাগল, কখনো চকের বাসস্ট্যান্ডে নকল পুলিশ, কখনো বা মোহিনী বাইজি—তাঁর প্রতিটি সাজই ছিল নিখুঁত ও বিস্ময়কর।
  • শিল্পীসত্তার মর্যাদা: হরিদা কেবল অর্থ উপার্জনের জন্য বহুরূপী সাজতেন না। তাঁর কাছে এটি ছিল একটি শিল্প। দয়ালবাবুর লিচু বাগানে নকল পুলিশ সেজে তিনি যখন মাস্টারমশাইকে বোকা বানান, তখন তাঁর অভিনয়ের কুশলতা প্রকাশ পায়।
  • নির্লোভ মানসিকতা: গল্পের ক্লাইম্যাক্সে দেখা যায়, বিরাগী সেজে তিনি জগদীশ বাবুর দেওয়া নগদ ১০১ টাকা অবলীলায় প্রত্যাখ্যান করেন। চরম দারিদ্র্য সত্ত্বেও তিনি নিজের অভিনীত চরিত্রের শুচিতা বা 'ঢং' নষ্ট করতে চাননি।
  • উপসংহার: হরিদা প্রমাণ করেছেন যে, শিল্পীর ক্ষুধা পেটে থাকতে পারে, কিন্তু তাঁর আত্মায় থাকে সততা ও আদর্শ। এখানেই হরিদা চরিত্রের সার্থকতা।

​২. 'বহুরূপী' গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো

ভূমিকা: সাহিত্যের নামকরণের ক্ষেত্রে সাধারণত বিষয়বস্তু, চরিত্র বা ব্যঞ্জনাধর্মিতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সুবোধ ঘোষের এই গল্পটির নাম দেওয়া হয়েছে হরিদার পেশার নামানুসারে— 'বহুরূপী'।

  • আক্ষরিক অর্থ: 'বহুরূপী' শব্দের অর্থ হলো যে বহু রূপ ধারণ করে। গল্পের প্রধান চরিত্র হরিদা বিচিত্র সব সাজে (পাগল, বাইজি, বিরাগী ইত্যাদি) নিজেকে উপস্থাপন করেন।
  • গভীরতর ব্যঞ্জনা: গল্পে 'বহুরূপী' শব্দটি কেবল পেশার পরিচয় নয়, বরং এটি হরিদার জীবনের এক জীবনদর্শন। সমাজের তথাকথিত ধনী ও ভণ্ড ধার্মিকদের (যেমন জগদীশ বাবু) মুখোশ খুলে দিতে হরিদা বিরাগীর ছদ্মবেশ ধারণ করেন।
  • শিল্পী বনাম অভাব: হরিদা দরিদ্র হলেও তাঁর শিল্পীসত্তা মহান। তিনি যখন বিরাগী সাজেন, তখন তিনি সত্যিই মনেপ্রাণে একজন বিরাগী হয়ে ওঠেন। সেই মুহূর্তে টাকা না নেওয়াটা তাঁর চরিত্রের এক অন্য রূপ বা 'বহুরূপী' সত্তার চরম সার্থকতা।
  • সিদ্ধান্ত: গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হরিদার বিচিত্র সব সাজ এবং তাঁর মানসিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে কাহিনী এগিয়েছে। তাই বিষয়মুখী নামকরণ হিসেবে 'বহুরূপী' অত্যন্ত সার্থক ও যথাযথ।

​৩. জগদীশ বাবুর বাড়িতে বিরাগী রূপী হরিদার অভিজ্ঞতার বর্ণনা

পটভূমি: হরিদা তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় খেলা দেখানোর জন্য জগদীশ বাবুর বাড়িতে বিরাগী সেজে গিয়েছিলেন।

  • রূপসজ্জা: হরিদার পরনে ছিল একটি সাদা উত্তরীয় এবং ছোট বহরের ধুতি। তাঁর মাথায় জটা নেই, শরীর ধুলোমাখা নয়—বরং এক অদ্ভুত শান্তশ্রী তাঁর চেহারায় ফুটে উঠেছিল। তাঁর ঝোলার ভেতরে শুধু একটি 'গীতা' ছিল।
  • আচরণের পরিবর্তন: সাধারণত হরিদা অভাবী ও সাধারণ মানুষ। কিন্তু বিরাগী সেজে তাঁর কথা ও ভঙ্গিতে এক মহাজাগতিক গাম্ভীর্য ফুটে ওঠে। জগদীশ বাবু যখন তাঁকে টাকা দিতে চান, তখন তিনি অত্যন্ত নিরাসক্তভাবে বলেন— "আমি কি কাঞ্চন ত্যাগ করে সোনা মাখতে পারি?"
  • নির্লিপ্ততা: জগদীশ বাবুর আতিথেয়তা এবং ১০১ টাকার প্রস্তাবকে হেলায় তুচ্ছ করে তিনি প্রমাণ করেন যে, সেই মুহূর্তে তিনি আর বহুরূপী হরিদা নন, তিনি প্রকৃতই একজন মায়ামুক্ত বিরাগী। তাঁর এই আচরণ বন্ধুদের এবং জগদীশ বাবুকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল।

​৪. "অভাব যেন তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে স্পর্শ করতে পারেনি"— মন্তব্যটির যথার্থতা

ভূমিকা: হরিদা চরম অভাবী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর জীবনবোধ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল সাধারণ মানুষের ঊর্ধ্বে।

  • স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা: হরিদার উচ্চাকাঙ্ক্ষা বলতে বড় কোনো বাড়ি-গাড়ির স্বপ্ন ছিল না। তাঁর আকাঙ্ক্ষা ছিল এক স্বাধীন ও শৈল্পিক জীবনের। অভাবের তাড়নায় তিনি অন্য কারো দাসত্ব বা একঘেয়ে কাজ করতে রাজি হননি।
  • লোভহীনতা: জগদীশ বাবু যখন সন্ন্যাসীকে পায়ের ধুলো দেওয়ার জন্য সোনার বোল লাগানো খড়ম দেন, তখন হরিদা তা দেখেও প্রলুব্ধ হননি। এমনকি পরে বিরাগী সেজে বড় অংকের টাকা পাওয়ার সুযোগ থাকলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।
  • শিল্পের জয়: হরিদার কাছে ভাতের হাঁড়িতে চাল থাকার চেয়ে নিজের শিল্পের 'ঢং' বজায় রাখা বেশি জরুরি ছিল। অভাব তাঁর পেটে টান দিলেও তাঁর নৈতিকতা ও শিল্পী হিসেবে তাঁর মাথাকে নিচু করতে পারেনি। তাই মন্তব্যটি অনস্বীকার্যভাবে সত্য।

​৫. বিরাগী চরিত্রের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত আধ্যাত্মিক দর্শন

দর্শন: সুবোধ ঘোষ হরিদার বিরাগী রূপের আড়ালে এক গভীর জীবনদর্শন ফুটিয়ে তুলেছেন।

  • মায়ার অসারতা: বিরাগী জগদীশ বাবুকে বলেন যে, টাকা-পয়সা বা ঐশ্বর্য হলো হাতের ময়লা। মোহমুক্ত হওয়াই প্রকৃত মানুষের ধর্ম।
  • অদ্বৈতবাদ: বিরাগী বলেছিলেন— "পরমাত্মা তো এক, শুধু দেহ আলাদা।" এটি উপনিষদীয় দর্শনের কথা, যা জগতের সবকিছুর মধ্যে এক পরম সত্তাকে অনুভব করতে শেখায়।
  • তৃষ্ণা ত্যাগ: মানুষের যাবতীয় দুঃখের মূল হলো তার অতৃপ্তি বা বাসনা। বিরাগী চরিত্রের মাধ্যমে লেখক বুঝিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি সব আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে পারে, সে-ই জগতের সবচেয়ে মুক্ত মানুষ। হরিদা অভিনয়ের ছলে হলেও এই গভীর সত্যটি দর্শকদের সামনে তুলে ধরেছেন।

পরীক্ষার জন্য টিপস:

  • পেশাগত সততা: হরিদা কেন বকশিশের ১০১ টাকা নিলেন না, এই অংশটি ভালো করে পড়বে (৫ নম্বরের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ)।
  • ছদ্মবেশের তালিকা: হরিদা কী কী সাজতেন (পাগল, বাইজি, পুলিশ, বিরাগী) এবং তাতে কত টাকা আয় হতো, তা ছক করে মনে রাখবে।
  • উদ্ধৃতি: ৩ ও ৫ নম্বরের উত্তরের ক্ষেত্রে পাঠ্য বইয়ের যুৎসই উদ্ধৃতি ব্যবহার করলে নম্বর বেশি পাওয়া যায়।



বহুরূপী' গল্পের গুরুত্বপূর্ণ ২০টি MCQ

​১. হরিদার ঘরের অবস্থান কোথায় ছিল?

(ক) শহরের বড় রাস্তার ধারে

(খ) শহরের একটি সংকীর্ণ গলির ভেতরে

(গ) গ্রামের এক প্রান্তে

(ঘ) নদীর ধারে

উত্তর: (খ) শহরের একটি সংকীর্ণ গলির ভেতরে

​২. জগদীশ বাবুর বাড়িতে আগত সন্ন্যাসী সারা বছর কী খেতেন?

(ক) ফলমূল

(খ) শুধু দুধ

(গ) একটি করে হরিতকী

(ঘ) পায়েস

উত্তর: (গ) একটি করে হরিতকী

​৩. সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো পাওয়ার জন্য জগদীশ বাবু কী করেছিলেন?

(ক) ৫০০ টাকা দিয়েছিলেন

(খ) সোনার বোল লাগানো খড়ম পরিয়েছিলেন

(গ) রুপোর থালায় খাবার দিয়েছিলেন

(ঘ) সশদণ্ড প্রণাম করেছিলেন

উত্তর: (খ) সোনার বোল লাগানো খড়ম পরিয়েছিলেন

​৪. চকের বাসস্ট্যান্ডে হরিদা কী সেজেছিলেন?

(ক) পুলিশ

(খ) বিরাগী

(গ) পাগল

(ঘ) বাইজি

উত্তর: (গ) পাগল

​৫. পাগল রূপী হরিদার হাতে কী ছিল?

(ক) একটি লাঠি

(খ) একটি ঝোলা

(গ) একটি ইঁট

(ঘ) একটি থালা

উত্তর: (গ) একটি ইঁট

​৬. বাইজি সেজে হরিদার মোট কত রোজগার হয়েছিল?

(ক) আট টাকা চার আনা

(খ) আট টাকা দশ আনা

(গ) দশ টাকা আট আনা

(ঘ) পাঁচ টাকা

উত্তর: (খ) আট টাকা দশ আনা

​৭. হরিদা পুলিশ সেজে কোথায় দাঁড়িয়েছিলেন?

(ক) স্কুলের সামনে

(খ) দয়ালবাবুর লিচু বাগানে

(গ) বাসস্ট্যান্ডে

(ঘ) বাজারের মোড়ে

উত্তর: (খ) দয়ালবাবুর লিচু বাগানে

​৮. নকল পুলিশ হরিদা কয়টি ছাত্রকে ধরেছিলেন?

(ক) দুটি

(খ) তিনটি

(গ) চারটি

(ঘ) পাঁচটি

উত্তর: (গ) চারটি

​৯. হরিদার উনুনে অনেক সময় ভাতের বদলে কী ফোটে?

(ক) ডাল

(খ) শুধু জল

(গ) দুধ

(ঘ) চা

উত্তর: (খ) শুধু জল

​১০. বিরাগী রূপী হরিদার ঝোলার ভেতর কী ছিল?

(ক) টাকা

(খ) খাবার

(গ) গীতা

(ঘ) তিলক

উত্তর: (গ) গীতা

​১১. "পরমাত্মা তো এক, শুধু দেহ আলাদা"— কথাটি কে বলেছেন?

(ক) জগদীশ বাবু

(খ) সন্ন্যাসী

(গ) বিরাগী

(ঘ) কথক

উত্তর: (গ) বিরাগী

​১২. জগদীশ বাবু বিরাগীকে তীর্থ ভ্রমণের জন্য কত টাকা দিতে চেয়েছিলেন?

(ক) ১০০ টাকা

(খ) ১০১ টাকা

(গ) ৫০০ টাকা

(ঘ) ১০ টাকা

উত্তর: (খ) ১০১ টাকা

​১৩. বিরাগী জগদীশ বাবুর কাছে কী চেয়ে খেয়েছিলেন?

(ক) ঠান্ডা জল

(খ) দুধ

(গ) ডাবের জল

(ঘ) সরবত

উত্তর: (ক) ঠান্ডা জল

​১৪. "অদৃষ্ট কখনো হরিদার এই ভুল ক্ষমা করবে না"— এখানে 'ভুল' বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

(ক) পুলিশ সাজা

(খ) জগদীশ বাবুর টাকা না নেওয়া

(গ) সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো না নেওয়া

(ঘ) বন্ধুর বাড়িতে না যাওয়া

উত্তর: (খ) জগদীশ বাবুর টাকা না নেওয়া

​১৫. হরিদা বিরাগী সেজে টাকা না নেওয়ার পেছনে কারণ কী ছিল?

(ক) তিনি ধনী ছিলেন

(খ) তাঁর ঢং নষ্ট হয়ে যাবে বলে

(গ) তিনি ভয় পেয়েছিলেন

(ঘ) জগদীশ বাবু কম টাকা দিচ্ছিলেন

উত্তর: (খ) তাঁর ঢং নষ্ট হয়ে যাবে বলে

​১৬. সন্ন্যাসীর বয়স আনুমানিক কত ছিল?

(ক) ১০০ বছর

(খ) ৫০০ বছর

(গ) ১০০০ বছরের বেশি

(ঘ) ৮০ বছর

উত্তর: (গ) ১০০০ বছরের বেশি

​১৭. লিচু বাগানে পুলিশ সেজে হরিদা মাস্টারমশাইয়ের কাছ থেকে কত ঘুষ নিয়েছিলেন?

(ক) দুই আনা

(খ) চার আনা

(গ) আট আনা

(ঘ) এক টাকা

উত্তর: (গ) আট আনা

​১৮. হরিদার কাছে কীসের কাজ করা ছিল বড়ই একঘেয়ে?

(ক) বহুরূপী সাজা

(খ) টিউশনি করা

(গ) কোনো অফিসের বা দোকানের কাজ

(ঘ) চাষবাস করা

উত্তর: (গ) কোনো অফিসের বা দোকানের কাজ

​১৯. "চমৎকার জোছনা ফিনিক দিয়ে ফুটছে"— এই পরিবেশটি কোন সময়ের?

(ক) ভোরবেলা

(খ) দুপুরবেলা

(গ) সন্ধ্যাবেলা

(ঘ) গভীর রাত

উত্তর: (গ) সন্ধ্যাবেলা

​২০. গল্পের শেষে হরিদা বকশিশের জন্য কত টাকা আশা করেছিলেন?

(ক) আট আনা

(খ) দশ টাকা

(গ) একশো টাকা

(ঘ) কিছুই না

উত্তর: (ক) আট আনা

এই প্রশ্নগুলো ভালো করে রিভিশন দিলে এমসিকিউ বিভাগে আপনি পূর্ণ নম্বর পেতে পারেন।





 বহুরূপী গল্পের প্রশ্ন উত্তর অনুশীলনী প্রশ্ন উত্তর


বহুরূপী গল্পের উৎস

সুবােধ ঘােষের রচিত ‘বহুরূপী’ গল্পটি লেখকের ‘গল্পসমগ্র’ গ্রন্থ থেকে সংকলিত।


বহুরূপী গল্পের বিষয়বস্তু


বিষয়-সংক্ষেপ


  শহরের সবচেয়ে সরু গলির সবচেয়ে ছােট্ট একটি ঘরে বহুরূপী হরিদার আবাস। তার সংসার বলতে সে একা। চাকরি-বাকরি করার যােগ্যতা ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তা করেন না। গতানুগতিক জীবনযাপন, বাঁধাধরা নিয়মের বাঁধনে জীবনাচরণ তার স্বভাববিরুদ্ধ। মাঝে মাঝে বহুরূপী সেজে যৎসামান্য আয়ে দিন চালানােয় অভ্যস্ত হরিদা।

 তিনি কখনও বাউল, কখনও কাপালিক, কখনও বোঁচকা কাধে বুড়াে কাবুলিওয়ালা, একবার তাে পুলিশ সেজে দয়ালবাবুর বাগানে চার স্কুলপড়ুয়া লিচু চোরকে ধরে হেডমাস্টারের কাছ থেকে সামান্য কিছু পয়সা পেয়েছিলেন। একবার তাে রূপবতী বাইজি সেজে অপূর্ব নাচের ভঙ্গিমায় শহরের পথচলতি মানুষজনকে মুগ্ধ করেছিলেন। সেবার বেশ কিছু আয়ও হয়েছিল তার। আর-একবার কোট-প্যান্ট-পরা ফিরিঙ্গি সাহেব সেজে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। 


  কয়েকটি কমবয়সি যুবক বহুরূপী হরিদার ঘরে সকাল-সন্ধেয় আড্ডা দিত। তারাই বহুরূপী গল্পের কথক। তারাই গল্পের ছলে ধনী জগদীশবাবুর বাড়িতে হিমালয় থেকে আগত এক সন্ন্যাসীর কথা শুনিয়েছিল হরিদাকে। সেই সন্ন্যাসী নাকি একটিমাত্র হরিতকী খেয়ে সারাবছর কাটিয়ে দেন। তার বয়স নাকি হাজার বছরের। হরিদা তার ২ পায়ের ধুলাে নেওয়ার প্রত্যাশী হতে, কথকরা শুনিয়েছে তার পায়ের ধুলাে নাকি খুবই দুর্লভ। তার পায়ে সােনার বােল লাগানাে খড়ম পরাতে গিয়ে জগদীশবাবু কোনােরকমে পায়ের ধুলাের অধিকারী হন। সন্ন্যাসীর বিদায়ের সময় ভক্ত জগদীশবাবু কৃপণ হওয়া সত্ত্বেও একশাে টাকা সন্ন্যাসী ঠাকুরের ব্যাগের মধ্যে দিয়ে দেন।

  গল্প শােনার পর উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত হরিদা গল্পকথক যুবকদের সন্ধ্যায় জগদীশবাবুর বাড়িতে হাজির থাকার কথা বলেন। আরও জানান যে, বহুরুপীর সাজে হাজির হয়ে তিনি এমন কিছু করবেন, যাতে তাঁর সারা বছর চলার মতাে অর্থ উপার্জিত হবে। যুবকেরা হরিদার কথা মতাে স্পাের্টসের চাদা আদায়ের অছিলায় জগদীশবাবুর বাড়ির বারান্দায় হাজির। জগদীশবাবু চেয়ারে উপবিষ্ট। হঠাৎ সিড়ির দিকে তাকিয়ে জগদীশবাবু বিস্মিত। 

 উপস্থিত কথক যুবকেরাও হতবাক। সিঁড়ির কাছে এসে যে দাঁড়িয়েছে সে ঠিক পরিচিত সন্ন্যাসীর মতাে বেশভূষায় নেই। তার জটাজুট নেই, কমণ্ডলু নেই, মৃগচর্ম নেই, গৈরিক পােশাক নেই। আদুড় গা, তার ওপর একটি সাদা উত্তরীয়, পরনে ছােটো সাদা থান, ধুলােমাখা পা, মাথায় ফুরফুর করে উড়ছে শুকনাে সাদা চুল। কথকরাও তাদের অতিপরিচিত হরিদাকে ছদ্মবেশী বলে মনে করতে পারছে না। এমন সুন্দর ও নিখুঁত সন্ন্যাসীর বেশে হরিদা হাজির। তার ঝােলায় একটি গীতা। তা ঝােলা থেকে বের করে হাতে নিয়েছেন। শান্ত-সমাহিত মূর্তির যােগী মানুষ যেন। যেন জগতের সীমার ওপর থেকে তিনি সমাগত।


  সন্ন্যাসীবেশী হরিদার উপস্থিতিতে জগদীশবাবুর বারান্দায় এক ভাবগম্ভীর পরিবেশ বিরাজ করছে। তার দু-চোখের শান্ত-সমাহিত দৃষ্টি, জ্ঞানগর্ভ কথা, সর্বোপরি তার নির্লোভ আচরণতার চরিত্রকে এক উন্নত মাত্রায় উন্নীত করেছে। তিনি জগদীশবাবুর দেওয়া প্রণামীর অর্থ গ্রহণ করেননি। তিনি পরে কথকদের বলেছেন জগদীশবাবুর কাছে একদিন গিয়ে বকশিশের টাকা চেয়ে আনবেন। সন্ন্যাসীর প্রণামী নয়, বহুরূপীর যেটুকু প্রাপ্য সেটুকুই।


বহুরূপী গল্পের নামকরণের সার্থকতা


নামকরণ


সাহিত্যেনামকরণগভীরশিল্পবােধকেতুলেধরে। চরিত্রকেন্দ্রিক, কাহিনিনির্ভর, রূপকধর্মী বা ব্যঞ্জনাময় নামকরণ মূলত সাহিত্যে লক্ষ করা যায়। সুবােধ ঘােষের ‘বহুরূপী’ গল্পে বহুরূপী হরিদার কথাই আদ্যন্ত পরিবেশিত হয়েছে। শহরের সবচেয়ে সরু গলির ছােট্ট একটা ঘরে থাকা বহুরূপী সাজা হরিদার ঘরেই গল্পের সূচনা।


কথাপ্রসঙ্গে কথকেরা জগদীশবাবুর বাড়িতে আসা এক সন্ন্যাসীর চমকপ্রদ কথা উত্থাপন করেন। সেই সন্ন্যাসীর প্রতি ধনী ভক্ত জগদীশবাবুর মহার্ঘ উপহার প্রদানের কথা শুনে হরিদাও কিছু বেশি প্রাপ্তির আশায় তার বাড়িতে বহুরূপী সেজে যেতে চান। এর আগে শহরে কখনও উন্মাদ সেজে, কখনও বা রূপবতী বাইজি, আবার কখনও বাউল, কাপালিক, কাবুলিওয়ালা ইত্যাদি সেজে হরিদা যৎসামান্য উপার্জন করতেন।


বিরাগী সেজে হরিদা জগদীশবাবুর বাড়িতে উপস্থিত হয়ে অদ্ভুত এক ভাবগম্ভীর পরিবেশ সৃষ্টি করেন। বহুরূপী হরিদার শান্ত সমাহিত দৃষ্টি, জ্ঞানগর্ভ কথাবার্তা, নির্লোভ আচরণ গল্পে এক অন্য মাত্রা আনে। জগদীশবাবুর প্রদেয় একশাে এক টাকার প্রণামীকে উপেক্ষা করেন দরিদ্র বহুরূপী হরিদা। গল্পের কথকেরাও বিরাগীর মধ্যে হরিদাকে আবিষ্কার করে চমৎকৃত হন। হরিদাও বহুরূপী সাজে বিরাগীর মধ্যে নিজের নির্লোভ মানসিকতাকে আবিষ্কার করেন।


কাহিনির শুরু হয়েছিল বহুরূপীর এক চিলতে ঘরে, সমাপ্তিও সেখানেই। সমস্ত কাহিনিতে বহুরূপী হরিদার বিচিত্র কার্যকলাপ পরিবেশিত হয়েছে। তাকে কেন্দ্র করে কাহিনির সূচনা, অগ্রগতি ও সমাপ্তি। তাই বহুরূপী এই চরিত্রনির্ভর নামকরণ সার্থক ও যথাযথ।


বহুরূপী গল্পের বড় প্রশ্ন উত্তর


প্রশ্নঃ ।। “খাটি মানুষ তাে নয়, এই বহুরুপীর জীবন এর বেশি কী আশা করতে পারে?” –বহুরুপী জীবনের এই ট্র্যাজেডি পাঠ্য বহুরূপী' গল্প অবলম্বনে আলােচনা করাে।


উত্তর : সুবােধ ঘােষের ‘বহুরূপী’ ছছাটোগল্পে বহুরূপীর পেশা নেওয়া হরিদার দারিদ্র্যপূর্ণ জীবনের কথা আছে। শহরের সবচেয়ে সরু গলির মধ্যে ছােট্ট একটি ঘরে হরিদা বাস করেন। দরিদ্র এই মানুষটি প্রথাগত কোনাে পেশাকে আঁকড়ে ধরেন না। নিয়ম মেনে কাজ করা সম্ভব হয় না বলে দারিদ্র্য হরিদার নিত্যসঙ্গী। তবে বহুরূপী সেজে হরিদা জীবনে কিছু বৈচিত্র্যও আনেন। উন্মাদ, কাপালিক, ফিরিঙ্গি বা রূপসিবাইজি সেজে কায়ক্লেশেদিনতার অতিবাহিত হয়। এই হরিদাই কথকদের মুখে ধনী মানুষ জগদীশবাবুর সন্ন্যাসীপ্রীতি ও সেইসূত্রে মহার্ঘ উপহার প্রদানের কথা জানতে পেরে তার বাড়িতে এক সন্ধ্যায় যন বিরাগী সেজে।


বিরাগী সাজা হরিদার অদ্ভুত সাজপােশাক, আচরণ দেখে মনে হয় চেনা পৃথিবীর পরিচিত মানুষ নন তিনি। তার শান্ত অন্তর্ভেদী দৃষ্টি, উচ্চস্তরের কথাবার্তায় মােহিত হয়ে জগদীশবাবু একশাে এক টাকা তীর্থযাত্রার পাথেয় হিসেবে দিতে চাইলে বিরাগী অনায়াসে তা উপেক্ষা করে চলে যান।


কথকের পরে তাকে এ বিষয়ে অনুযােগ করলে হরিদা জানান বিরাগী স্যজার বকশিশ তিনি জগদীশবাবুর কাছ থেকে নিয়ে আসবেন একদিন। এই সময় বিড়ি ধরিয়ে সলজ্জ হরিদা বলেন যে যেহেতু তিনি খাটি মানুষ নন, নিতান্ত এক সাধারণ হুরূপী; তাই এর বেশি আশা করেন না। তথাকথিত উচ্চমানের পেশ না হওয়ার যন্ত্রণা বহুরুপী সাজা হরিদাকে কষ্ট দেয়।  বহুরুপীর মতাে নিতান্ত সাধারণ জীবিকা হরিদাদের কখনােই স্বপ্ন দেখায় না, সমাজে উচ্চ মর্যাদা দেয় না। কঠিন জীবন সংগ্রামে অভ্যস্ত দরিদ্র হরিদা এই বাস্তব সত্যকে বােঝেন বলেই যন্ত্রণাদায় কথাগুলি বলেন।

বহুরূপী গল্প

প্র)  “অদৃষ্ট কখনও হরিদার এই ভুল ক্ষমা করবে ।”—হরিদা কী ভুল করেছিলেন? অদৃষ্ট ক্ষমা না করার পরিণাম কী? 


উওর : বহুরূপী হরিদাকে বিরাগী ছদ্মবেশে দেখে, তাকে যথার্থ { বিরাগী ভেবে জগদীশবাবু তীর্থভ্রমণের জন্য যে একশাে এক টাকা দিয়েছিলেন হরিদা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর এই কাজ ক্ষমার অযােগ্য ভুল বলেছেন গল্পকথক।


অদৃষ্টহরিদারএইভুলকেকখনওক্ষমাকরবেনা।কারণএইভুলটাই হরিদার জীবনদর্শন। ভুলের সংশােধন আছে, কিন্তু জীবনদর্শনের পরিবর্তন সহজে ঘটে না। হরিদা স্বভাবশিল্পী মানুষ। তাই তাে কাজের একঘেয়েমি, ঘড়ির কাঁটার শাসন মেনে চলেত তাঁর প্রবল আপত্তি। পাখির গানে যেমন কোনাে অনুশাসন থাকে না, মেঘের কারুকাজ যেমন অনুশাসনমানেনা, তেমনিহরিদামুক্তপ্রাণ মানুষ। অর্থসওয়ের স্বার্থবুদ্ধি তার মােটেই নেই। বহুরূপীর সাজগ্রহণ তাঁর পেশা হলেও মূলত নেশা।শুধুঅর্থউপার্জনের জন্য তিনি সাজগ্রহণকরেননা।এই সাজগ্রহণ তার জীবনের শিল্প। এই শিল্পের মূল্যায়নের মধ্যেই তার জীবনের স্বার্থকতা নিহিত আছে। দারিদ্রতাকে কোনাে দিন দীন করতে পারেনি। তার সততা, ন্যায়-নিষ্ঠাকে নষ্ট করতে পারেনি। বস্তুত দারিদ্র্য তার খুব একটা সহ্যাতীত কিছু নয়। যার ফলে জগদীশবাবুর বাড়িতে যে ভুল ঘটে গেল সে ভুল তার বার বার ঘটবে। অর্থউপার্জনের পথগুলি চিরকাল অবরুদ্ধ থাকবেতার কাছে। সম্পদলক্ষ্মী কোনােদিন সুপ্রসন্না হবেন না। কোনাে দিন শেষ হবেনা তার দারিদ্র্যে ভরা জীবন। অদৃষ্ট ফিরবে না কখনও।


প্রশ্নঃ) জগদীশবাবুর-বাড়িতে হরিদা বিরাগী সেজে যাওয়ার পর যে ঘটনা ঘটেছিল তা সংক্ষেপে লেখাে। 


উত্তর : সুবােধ ঘােষের ‘বহুরূপী’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হরিদা  বিশেষ উদ্দেশ্যে বিরাগীর ছদ্মবেশে জগদীশবাবুর বাড়িতে হাজির হয়েছিলেন। আদুড় গায়ে একটি ধবধবে সাদা উত্তরীয়। পরনে ছােটো বহরের একটি গান। মাথায় ফুরফুরে শুকনাে সাদা চুল। ধুলাে মাখা পা। হাতের ঝোলায় একটি গীতা। একেবারে পুরােদস্তুর বিরাগী। তাঁকে দেখে জগদীশবাবু চমকে ওঠেন। চমকে ওঠেন সেখানে হাজির হরিদার বন্দুরাও। হরিদাকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি যেন এই জগতের সীমার ওপার থেকে হেঁটে আসছেন। কিংকর্তব্যবিমূঢ় জগদীশবাবু নেমে না এসেই আহ্বান জানালে হরিদা তাকে ভৎসনা করেন। তাঁর সম্পত্তির অহংকারকে কটাক্ষ করেন। জগদীশবাবুপরাধ স্বীকার করে নিয়ে বিরাগীবেশী হরিদাকে রাগ করতে বারণ করেন। হরিদা জানান । যে, তাঁর রাগ নামে কোনাে রিপু নেই। জগদীশবাবু তার সেবা করতে ? চাইলে তিনি এক গ্লাস ঠান্ডা জল শুধু পান করেন। তার গৃহে কয়েকটা দিন থেকে যেতে বললে তিনি হেসে সে অনুরােধ প্রত্যাখ্যান করেন।


ভাবাবেগবিহ্বল জগদীশবাবু যেনতেনপ্রকারের্তাকে কিছু দিতে চেয়ে ব্যর্থ হন। জগদীশবাবুর মনের শান্তির জন্য উপদেশ হিসেবে বিক বলেন যে, ধন-জন-যৌবন আসলে কিছুই নয়, ওগুলি এক-একটি সুন্দর সুন্দর বঞ্চনা। যাকে পেলে সব পাওয়া হয়ে যায় সেই ঈশ্বরের আপন হওয়া প্রয়ােজন।


বিরাগী ব্যক্তিতে, জ্ঞানের গভীরতায় মহত্ত্বে আবেগের চরম সীমায় পৌঁছে গিয়ে একশাে এক টাকার প্রণামী দিতে চেয়েছিলেন। জগদীশবাবু, কিন্তু বিরাগীর কাছে টাকা আর মাটিতে তফাত নেই। মাটি মাড়িয়ে যাওয়ার মতাে করে একশাে এক টাকার থলিটা সিড়ির ওপরে রেখে নানান সংশয় আর বিস্ময়ের মধ্যে সবাইকে রেখে  হরিদা বেরিয়ে আসেন।


প্রশ্ন)  “হরিদার উনানের হাঁড়িতে অনেকসময় শুধু জল ফোটে, ভাত ফোটে না।’-অংশটির তাৎপর্য লেখাে।


উত্তর : শহরের সরু গলির মধ্যে থাকা অতিশয় ছােটো একটি ঘরে থাকেন বহুরূপী হরিদা। অতিশয় দরিদ্র হলেও কোনাে ধরাবাঁধা কাজে নিজেকে জড়িয়ে রাখেন না। কোনাে অফিস কিংবা দোকানে কাজ করার সুযােগ থাকলেও তিনি তা করেন না।


বহুরূপী হরিদার মধ্যে শিল্পীসত্তা প্রবলভাবে উপস্থিত। বহুরূপী সেজে সকালে কিংবা সন্ধ্যার সময় শহরের পথে বেরিয়ে পড়েন। কিছু রােজগারের আশায়। কখনও উন্মাদ সেজে বাসযাত্রীদের ভয় দেখান, কখনওবা অন্য কিছু সাজেন। একবার এক রূপবতী বাঈজী সেজে প্রায় নাচতে নাচতেশহরের পথেযখন হেঁটে যান, তখনশহরে আসা নতুন লােকেরামুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। বাউল, কাপালিক, বোঁচকা কাধে বুড়াে কাবুলিওয়ালা, কোট-প্যান্ট পরা ফিরিঙ্গি সাহেব সাজেন বহুরূপী হরিদা। একবার পুলিশ সেজে দয়ালবাবুর লিচু বাগানের ভিতরে দাঁড়িয়ে স্কুল পালানাে চারটে ছেলেকে ধরে মাস্টারমশাইয়ের কাছ থেকে সামান্য টাকাও নিয়েছিলেন হরিদা। এক ধরনের সৎ মনােবৃত্তি তার মধ্যে রয়েছে। তাই জগদীশবাবুর বাড়িতে ‘জবর খেলা দেখিয়েও বিপুল অর্থপ্রাপ্তির সুযােগকে দারিদ্র্য। তার উনুনে চাপানাে হাঁড়িতে অনেক সময় চাল থাকে না, হেলায় তুচ্ছ করেন। তাই বহুরূপী সাজা হরিদার জীবনে শুধুই শুধু গরম জলই ফোটে।

বহুরূপী গল্প

প্রশ্নঃ।।  “হরিদার জীবনে সত্যিই একটা নাটকীয় বৈচিত্র্য আছে।'—হরিদার পরিচয় দাও। তার জীবনের নাটকীয় বৈচিত্র্যের দিকটি ব্যাখ্যা করাে। 

  অথবা, খুব গরীব মানুষ হরিদা।'—হরিদা কে ছিলেন? তার জীবনের নাটকীয় বৈচিত্র্য কী ছিল? 


উত্তর : প্রখ্যাত লেখক সুবােধ ঘােষের ‘বহুরূপী’ গল্পের প্রধান চরিত্র হরিদা। তিনি নেশা এবং পেশায় বহুরূপী। শহরের সবচেয়ে সরু গলির ভিতরে ছােট্ট একটি ঘরে হরিদার বসবাস। তিনি এতটাই দরিদ্র যে অন্নাভাবে মাঝে মাঝেই উপােষ করেন। একঘেয়ে অভাবটাকে। তিনি সহ্য করতে পারেন তবুও একঘেয়ে কাজ করায় তাঁর প্রবল আপত্তি। হরিদা ইচ্ছে করলে কোনাে অফিসের কাজ কিংবা কোনাে দোকানে বিক্রিওয়ালার কাজ পেয়ে যেতে পারেন। কিন্তু এই ধরনের কাজ তাঁর পছন্দ নয়। ঘড়ির কাঁটার শাসন মেনে, রােজই একই কাজ করে যাওয়া স্বভাবশিল্পী হরিদার পক্ষে সম্ভব নয়।


অভাবের নিদারুণ দংশন হরিদার হৃদয়ের শিল্পীটাকে মােটেই আহত করতে পারে না। বিচিত্র শিল্পভাবনায় তিনি তাঁর মুক্ত বিহঙ্গ হৃদয়টিকে বৈচিত্র্যের সন্ধানে বর্ণময় করে রাখেন। বহুরূপী হিসেবে সাজ এবং অভিনয়ে একদম নিখুঁত শিল্পী তিনি। দুপুরবেলা চকের বাসস্ট্যান্ডে উন্মাদ পাগলের বেশে তিনি একেবারে আতঙ্কের হল্লা বাজিয়ে দেন। ভয়ে যাত্রীরা চেঁচিয়ে ওঠে নতুবা পয়সা ছুড়ে দেয়। লাস্যময়ী বাইজির ছদ্মবেশে শহরে নতুন আসা মানুষদের বুকে ঢেউ তুলে ঘুঙুরে মিষ্টি রুমঝুম শব্দ তুলে নাচতে নাচতে চলে যান। পুলিশের ছদ্মবেশে দয়ালবাবুর লিচু বাগানে দাঁড়িয়ে থেকে চারটি ছাত্রকে ধরে স্কুলের মাস্টারের কাছ থেকে ঘুষ আদায় করে নেন। হরিদার জীবনের নাটকীয় বৈচিত্র্যের চরমতম রূপটি দেখা যায় জগদীশবাবুর বাড়িতে। বিরাগীর ছদ্মবেশে ধনবান জগদীশবাবুকে তিনি মুগ্ধ করে ফেলেন, কিন্তু তাকে প্রকৃত বৈরাগী ভেবে আবেগাপ্লুত জগদীশবাবুকে একশাে এক টাকা তীর্থভ্রমণের জন্য দিলে তিনি স্পর্শ করেও দেখেননি। কারণ বিরাগী ছদ্মবেশে তিনি অর্থ স্পর্শ করতে পারেন না। এতে তার ঢং নষ্ট হয়ে যায়। তবে বকাশিশ তিনি অবশ্যই নেবেন।


প্রশ্নঃ) এই শহরের জীবনে মাঝে মাঝেই অদ্ভুত ঘটনা সৃষ্টি করেন হরিদা।’-হরিদা যে অদ্ভুত ঘটনাগুলি সৃষ্টি করেছিলেন তার বর্ণনা দাও। 


উত্ত: সুবােধ ঘােষের ‘বহুরূপী’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হরিদা  বর্ণময় চরিত্রের একজন ভাবশিল্পী মানুষ। বহুরূপীর ছদ্মবেশ ধারণ তার নেশা এবং পেশা। যে-কোনো ছদ্মবেশে তিনি এতাে স্বাভাবিক ” বাস্তবসম্মত হয়ে ওঠেন যে তাকে কেন্দ্র করে অদ্ভুত অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটে যায়।


চকের বাসস্ট্যান্ডের কাছে একদিন দুপুরবেলা উন্মাদ পাগলের ছদ্মবেশে একটা আতঙ্কের হল্লা তুলেছিলেন। মুখ থেকে লালা ঝরছে, চোখ দুটি কটকটে লাল, কোমরে একটা ছেড়া কল। জড়ানাে। গলায় টিনের কৌটোর একটা মালা। একটা থান ইট তুলে বাসের যাত্রীদের দিকে তেড়ে যাচ্ছেন। যাত্রীরা তাকে দেখে কেউ ভয়ে চেঁচিয়ে উঠছে, কেউবা দুটো-একটা পয়সা ফেলে দিচ্ছে।


একদিন সন্ধ্যায় ঘুঙুরের মিষ্টি রুমঝুম শব্দ তুলে এক বুক বাইজির ছদ্মবেশে দোকানে দোকানে ব্যস্ত লােকজনকে বিস্মিত করে নাচতে নাচতে হেঁটে যান। শহরে নতুন আসা মানুষগুলি চোখ বলে করে চেয়ে থাকে। তারপর তাকে একটা বহুরূপী জেনে হতাশ হয় হরিদা দোকানে দোকানে মুচকি হেসে চোখ টিপে ফুলসাজি এগিয়ে দিয়ে পয়সা তােলেন।


তার সাজের শেষ নেই। বাউল, কাপালিক, বুড়াে কাবুলিওয়ালা, ফিরিঙ্গি কেরামিন সাহেব ইত্যাদি যে-কোনাে ছদ্মবেশে শহরের মানুষকে মাৎ করে দেন তিনি। পুলিশ সেজে একবার দয়ালবাবুর লি বাগানে দাঁড়িয়ে থেকে স্কুলের চারটা ছেলেকে তিনি ধরেছিলেন। ভয়ে ছেলেগুলি কেঁদে ফেলেছিল। স্কুলের মাস্টার এসে নকল পুলিশ হরিদার কাছে ক্ষমা চেয়ে, আট আনা ঘুষ দিয়ে ছেলেগুলিকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান। পরে প্রকৃত ঘটনা জানতে পেরে ক্রুদ্ধ না হয়ে বহুরূপী হরিদার প্রশংসাই করেন।

বহুরূপী গল্পের প্ৰশ্ন উত্তর 2026

প্রশ্নঃ) পরম সুখ কাকে বলে জানেন? সব সুখের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যাওয়া।–বক্তা কখন এই উক্তি করেন? তার জীবনেও কী এই বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা যায় যুক্তিসহ লেখাে। 


উত্তর : সুবােধ ঘােষের বহুরূপী’ গল্পে হরিদা বিরাগীর ছদ্মবেশে জগদীশবাবুর বাড়িতে উপস্থিত হলে তার সাজ-পােশাক, ভাবমূর্তি দেখে জগদীশবাবু চমকে যান। চমকে যান স্বয়ং গল্পকথক ও তাঁর বন্ধুরাও। বিরাগীবেশী হরিদার ভাষাও তার ভূমিকাকে উজ্জ্বল করে তােলে। মুগ্ধ জগদীশবাবু এই বিরাগীকে সেবাদানের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। গল্পকথকের বন্ধু ভবতােষও তাকে প্রকৃত বিরাগী হিসাবেই গণ্য করেন। মােট কথা সেই সন্ধ্যায় জগদীশবাবুর বাড়িতে উপস্থিত সকলেই তাকে শান্ত-সৌম্যকান্তি, সংসারত্যাগী, সর্বত্যাগী, জ্ঞান, বিরাগী বলেই মনে করেন। এই অবস্থায় হরিদা এই উক্তি করেন।


হরিদার এই উক্তি ছদ্মবেশী বিরাগীর চরিত্রের মুখের মানানসই একটি উক্তি হলেও তাঁর জীবনদর্শনে এর প্রতিফলন দেখা যায়। হরি স্বভাবশিল্পী মানুষ। কাজের একঘেয়েমি, আর ঘড়ির কাঁটার শাসন মানতে পারেন না বলে দারি) নিত্যসঙ্গী। বহুরূপীর সাজ দেখিয়ে যে সামান্য উপার্জন হয় তাতে তাঁর হাঁড়ির দাবি মেতে । মাঝে মাঝে উপােষ করতে হয় তাকে। তবে সংসারের দৈন তার অন্তরকে দীন করতে পারেনি। বহুরূপী হিসেবে তার সাজের


প্রতিটা চরিত্রের মর্যাদা তিনি অক্ষুন্ন রেখে চলেন। কোনাে ধরনের প্রতারণা করেন না। তার বিরাগীর ছদ্মবেশে জগদীশবাবু যথার্থই বিভ্রান্ত হয়েছিলেন। তাকে তীর্থভ্রমণের জন্য একশাে এক টাকা দিতে চেয়েছিলেন। বিরাগীর সাজের মর্যাদা রাখতে গিয়ে সে টাকা তিনি গ্রহণ করেননি। যথার্থ বিরাগীর মতাে অর্থের মােহকে অগ্রাহ্য এভাবে একজন বহুরূপী থেকে তিনি উন্নীত হয়েছেন পরমজ্ঞানী বিরাগীর পর্যায়ে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ